একাত্তরের যোদ্ধারা

ছয়দানার যুদ্ধেই শুনেছি স্বাধীনতার পদধ্বনি

আমার যুদ্ধক্ষেত্র ছিল গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প এলাকা ও তার আশপাশের এলাকা। আমি ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নিয়ে প্রথমে কিছুদিনের জন্য ইছরকান্দি গ্রামে, অতঃপর ঢাকার দিকে আরও অগ্রসর হয়ে ‘বাখরাল’ নামক গ্রামে অবস্থান করছিলাম। ১৪ ডিসেম্বর সকালের দিকে আমাদের কাছে সংবাদ এলো, পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন আমরা সবেমাত্র সকালের নাস্তা নিয়ে বসেছি। আর কার নাস্তা কে খায়। আমাদের এলাকার সুরক্ষায় দৌড়ে গিয়ে যার যার অস্ত্র নিয়ে গ্রামটির চারদিকে পজিশন নিলাম। আমার অস্ত্রটি ছিল ইন্ডিয়ান এসএলআর। একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। আমি গ্রামটির পশ্চিম দিকে পজিশন নিতে গিয়ে দেখি, আমাদের অবস্থানের পশ্চিম দিকে শতাধিক পাকিস্তানি আর্মি আমাদের গ্রামটিকে ঘেরাও করে ফেলতে যাচ্ছে। আমাদের অবস্থানকৃত গ্রামটির পূর্বদিকে টঙ্গীর শহর আর পশ্চিম দিকে আশুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হাওরসম জলা বোরোভূমি। আমার মনে হলো পাকিস্তানি বাহিনী চারদিক থেকেই আমাদেরকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। জীবনে বেঁঁচে থাকার আশাটুকু উবে গেল। বুকে অসীম সাহস নিয়ে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে বোরো ক্ষেতের একটা অপেক্ষাকৃত উঁচু আইলকে আড় বানিয়ে আল্লাহর নামে ফায়ার ওপেন করলাম। সাথে সাথেই পাল্টা আক্রমণ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ থেকে ঝঁাঁকে ঝাঁকে ব্রাশফায়ারের গুলি আমার মাথার ওপর দিয়ে চোং চোং করে চলে যাচ্ছে। আমি আমার অবস্থান থেকে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে এগিয়ে এসে পড়েছিলাম, শত্রু বাহিনীকে আমার অস্ত্রের নাগালের (রেঞ্জের) মধ্যে আনার জন্য। এরই মধ্যে আশপাশের গ্রামে লুকিয়ে থাকা সব মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ শুরু করে। আমরা কয়েক বন্ধু একটু এগিয়ে যাওয়ার ফলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা আমাদের পেছন থেকে কোনোরূপ লাইনফাইল না মেনেই পাকিস্তানি আর্মির প্রতি গুলি ছুড়তে থাকে আমিসহ কয়েক বন্ধু সামনে থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর গুলি ও পেছন থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির মধ্যখানে এক ভয়ংকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। এমন সময় দেখলাম আমার ঠিক পাশেই মাঠে বিচরণকৃত একটি ষাঁড় বাছুর পাকিস্তানি আর্মির ও মুক্তিযোদ্ধাদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মাথায় আঘাত পেয়ে আমার চোখের সামনে ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যায়। এমতাবস্থায় পাকিস্তানি আর্মির গোলার চেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবর্ষণই আমার জন্য মারাত্মক হয়ে গেল। আমি আমার অবস্থান ছেড়ে আরও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়া অধিকতর উত্তম মনে করলাম। এ মুহূর্তে অবস্থান থেকে নড়াচড়া করাও খুবই বিপজ্জনক। তথাপি ক্ষণিকের জন্য চিন্তা করে এ অবস্থান ছেড়ে যাওয়া অধিকতর উত্তম মনে করে বোরো ক্ষেতের উঁচু আইলকে আড় বানিয়ে প্রায় এক মাইল দূরত্ব পর্যন্ত ক্রলিং করে এগিয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম শত্রুকে দক্ষিণ পাশ দিয়ে আক্রমণ করব। দেখলাম শত্রুসেনারা আমাদের অবস্থানকে ‘রেইড’ বা কোনোরূপ আক্রমণ না করে দক্ষিণে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা রাইফেলের সিঙ্গেল শট মেরে বোরো জমির উঁচু আইল ধরে শত্রুর কিছুটা রাইফেলের রেঞ্জের কাছাকাছির দিকে গেলেই পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের দিকে এলএমজির ব্রাশফায়ার করে আমাদের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। এরপর তারা দিব্যি হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যা নাগাদ যুদ্ধ চলল, আমরা ৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে আটক করলাম, তন্মধ্যে এক পাকিস্তানি সেনা নিজেই নিজের থুঁতনির নিচে রাইফেলের নল লাগিয়ে নিজের মস্তককে উড়িয়ে দিল।

সেদিন যুদ্ধের মাঠে সর্বান্তকরণে উপলব্ধি করেছিলাম যে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা শত্রুর মোকাবেলা কর, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’ বঙ্গবন্ধুর সে নির্দেশের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবরূপে নিয়েছে কেননা আজকের যুদ্ধে কাশিমপুর থেকে রোস্তমপুর হয়ে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের আগ পর্যন্ত এ সুদীর্ঘ হাওরসদৃশ বোরো জমির পূর্ব ও পশ্চিমের সব কয়টি গ্রাম ছিল এক একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। বোরো জমির কাদামিশ্রিত পানিতে বুট-মোজা ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ায় মছুয়া পাকিস্তানি বাহিনীর নাকানি-চুবানির যে কী দুরবস্থা হয়েছিল তা প্রত্যক্ষভাবে না দেখলে কাউকে বুঝানো যাবে না।

হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের এহেন অবস্থা দেখে আমি সেদিন এক যোদ্ধা হিসেবে আমার অনুভবে এলো আমার মহান নেতা কী করে বুঝেছিলেন হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর এমন অবস্থা হবে; তাই তিনি বলে গিয়েছিলেন, ‘আমরা তোমাদেরকে ভাতে মারব, পানিতে মারব।’

সেদিনের যুদ্ধ শেষে আমার বাখরাল ক্যাম্পে যেতে অনেকটা বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল। আমার অন্য সহযোদ্ধারা তাদের মাঝে আমাকে না দেখে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিল হয়ত আমি নেই; আশপাশের এলাকায়ও এমন একটা রটনা ছড়িয়ে পড়েছিল আমি নেই। কিন্তু শেষাবধি আমাকে জীবন্ত দেখে অনেক আপনজনই যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন।

আশুলিয়ার এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনী শুধু আত্মরক্ষামূলক গুলি করেছে। কিন্তু কেন? পরে অবশ্য জানতে পেরেছি, পাকিস্তানি বাহিনী তাদের আত্মরক্ষার্থে কড্ডা ব্রিজ থেকে নেমে ঢাকামুখী পলায়নরত পাকিস্তানি সেনা কাশিমপুর, তৈয়বপুর, আশুলিয়া ও রোস্তমপুর এলাকার বিভিন্ন গ্রামকে ডানে রেখে এবং একইভাবে ইছরকান্দি, আন্দারিয়া, বাখরাল ও বাধাম এলাকাকে বামে রেখে কড্ডা থেকে মিরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হাওরসদৃশ জনমানবহীন নির্জন জলা বোরো জমিকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করে বোরো জমির আইলের ওপর দিয়ে হেঁটে কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালাচ্ছিল। পলায়নরত দখলকার পাকিস্তানি বাহিনী কি বুঝতে পেরেছিল! যুদ্ধের মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলার প্রতিটা ঘর ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির এক একটি স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠেছে। আশুলিয়ার এ যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া পাকিস্তানি বাহিনী তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।

তবে কুচক্রি পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের আগে পলায়নের পথে তাদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র খালে, বিলে, নদীনালায়, ঝোঁপঝাড়ে, এখানে সেখানে ফেলে রেখে যায়, যাতে করে আধুনিক এসব অস্ত্রশস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের হাতে পড়ে ভবিষ্যতে এ দেশটি যেন একটি অস্থিতিশীল দেশে পরিণত হয়।

তবে ১৫ ডিসেম্বরের ছয়দানা যুদ্ধে আমি ও সহযোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু মিত্র বাহিনীর অব্যর্থ কামানের গোলা ও মর্টার শেলের আক্রমণেই পাকিস্তানি বাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে যায়। এ যুদ্ধে মুক্তি বাহিনীকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। তাছাড়া হানাদাররা যুদ্ধ করার চেয়ে জান বাঁচানোর জন্য ঢাকা পৌঁছানোই তাদের মূল টার্গেট ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগে ঢাকা উত্তরে ছয়দানার যুদ্ধই শেষ যুদ্ধ ছিল। সেদিনই যেন আমরা মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন পতাকার পত্ পত্ ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম।

লেখক : চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা, মামস-এম এ আউয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সভাপতি, হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদ, কামারপাড়া, তুরাগ, ঢাকা-১২৩০।