সকল বাংলাদেশি হজযাত্রীর ভিসা ক্লিয়ারেন্স হবে ঢাকায়

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশে^ তেল সরবরাহের বিষয়ে কোনো উদ্বেগ নেই বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশি হজযাত্রীদের ভিসা ক্লিয়ারেন্সের শতভাগ কার্যক্রম ঢাকায় সম্পন্ন করার বিষয়ে আশ^াস দিয়েছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তি ও একটি সমঝোতা  স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে উভয় দেশের মধ্যে কাস্টমস সহজীকরণ এবং বাংলাদেশের ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমি ও প্রিন্স সাউদ আল ফয়সাল ইনস্টিটিউট ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিজের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে ওই চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক হয়। দুই দেশের পক্ষে এতে সই করেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর আগে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সংলাপ হয়। এতে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।  

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তেল সরবরাহের বিষয়ে আমরা স্থিতিশীল বাজারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ বৈঠকে ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়।

সংলাপে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের আমন্ত্রণে দুই দিনের সফরে গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল দুলাইহান ও সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া বৈঠকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রোহিঙ্গা সংকট এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে সৌদি আরব থেকে একটি বড় বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়াদের ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করতে সব কার্যক্রম সম্পন্ন হবে ঢাকায়, যাতে তাদের কষ্ট কমে যায়। এ বিষয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। তারা আমাদের হাজিদের জন্য এই সেবা নিশ্চিত করবেন।’

ড. মোমেন বলেন, ‘শতভাগ ভিসা ক্লিয়ারেন্স যেন বাংলাদেশে হয় সে জন্য তারা সহযোগিতা করবেন। সব ধরনের কার্যক্রম এখানে হলে কোনো হয়রানি হবে না। এতে আমাদের হাজিরা খুব খুশি হবেন।’

সৌদি আরবের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও সবুজায়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ কাজ করতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ড. মোমেন বলেন, ‘প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ হলো।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সবুজায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৫০ বিলিয়ন গাছ লাগানো হবে। এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন সৌদি আরবে এবং বাকি ৪০ বিলিয়ন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে। আমরা গাছ দিতে চাই এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে চাই।’

খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্যনিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন এবং আমরা বলেছি, আমরা তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা বিভিন্ন দেশে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের আয়োজন করছে এবং পার্টনার হিসেবে তারা আমাদের নিতে পারে।’

সৌদি বিনিয়োগ বিষয়ে ড. মোমেন বলেন, ‘সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে সৌদি কোম্পানিগুলোকে। ইতিমধ্যে ২০টি কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করি, শিগগিরই বাস্তবায়ন শুরু হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলেছি। এর মধ্যেই ২০টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। শিগগিরই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতি বছর ২৬৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দেয় সৌদি আরব। তবে মাত্র ৮০ জন শিক্ষার্থী যায়। কোটা কেন পূরণ হয় না? এ বিষয়ে আমরা আলাপ করেছি।’

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল দুলাইহান বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব অভিন্ন পথ চলছে। উভয় দেশের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ ভালোই। উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।’

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের উদ্যোক্তারা এখানে (বাংলাদেশ) বিনিয়োগে আগ্রহী। তারা বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ঢাকা সফরও করেছিলেন। বৈশি^ক মহামারী বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশা করি, খুব দ্রুত সৌদি আরবের ২৩টি বড় উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান এখানে তাদের বিনিয়োগ নিয়ে হাজির হবে।’

দীর্ঘ ছয় বছর পর সৌদি আরবের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেন। এর আগে ২০১৬ সালের মার্চে তৎকালীন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল যুবায়ের ঢাকা সফর করেন।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে দেশটির উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।