চেম্বারে এক দিন এক মা তার ১৫ বছরের ছেলেকে নিয়ে ঢুকেই আতঙ্কিত চেহারায় বললেন, তার ছেলের গালের দুপাশ তিন দিন ধরে ফুলে আছে। দেখেন স্যার টনসিল কি না? সঙ্গে থাকা তার ছেলেও বলল, তার দুই অন্ডকোষেও ব্যথা হচ্ছে আজ থেকে। আমি পরীক্ষা করে গলার ভেতরে দেখলাম টনসিল এবং আশপাশে স্বাভাবিক। কিন্তু দুপাশের গাল ফোলা এবং স্পর্শ করলেই ব্যথা। সঙ্গে জ্বরও আছে।
মানবদেহে মুখের ভেতর লালা নিঃসরণকারী তিন ধরনের গ্রন্থি রয়েছে। লালাগ্রন্থিকে Salivary Gland বলে এবং লালাকে Saliva বলা হয়। লালাগ্রন্থি লালা নিঃসরণ করে খাবার হজমে সাহায্য করে; মুখের ভেতরের তাপমাত্রা বজায় রাখে এবং লালা মুখের ভেতরকে ভেজা রেখে কথা বলতে সাহায্য করে। লালাগ্রন্থিতে ইনফেকশন হলে গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না; ফলে মুখের ভেতর জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে।
কানের নিচে ম্যান্ডিবল হাড়ের/চোয়ালের কোনায় গালের দুপাশে প্যারোটিড গ্রন্থির অবস্থান। প্যারোটিড গ্রন্থির প্রদাহ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে, তবে সবচেয়ে বেশি ঘটে ভাইরাসের কারণে। এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। মাম্পস ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত এই প্যারোটিড গ্রন্থির প্রদাহকে বলা হয় ‘মাম্পস’। গ্রামগঞ্জে শিশুর এই রোগকে বলা হয় গাল ফোলা রোগ। একবার মাম্পসে আক্রান্ত হলে বা টিকা দেওয়া থাকলে সারা জীবনের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মে।
কীভাবে ছড়ায়
মাম্পস ভাইরাস সাধারণত শ্বাসনালির পথে আক্রমণ করে। মাম্পসের লক্ষণ প্রকাশের দুদিন আগে থেকে এবং প্রকাশের পর পাঁচ দিন পর্যন্ত মাম্পস ছড়াতে থাকে। এজন্য মাম্পস প্রকাশের প্রথম পাঁচ দিন বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে নিষেধ করা হয়।
লক্ষণ
মাম্পস হলে গালের দুপাশের প্যারোটিড গ্রন্থি ফুলে যায়, সঙ্গে থাকে প্রচ- ব্যথা। তবে একপাশেও একা ফুলতে পারে। কান ওপরে উঠে যায় সামান্য। শরীরে অনেক জ্বর থাকে। ঢোক গিলতে ব্যথা লাগে; আক্রান্তরা সহজে খেতে পারে না। কথা বলতে কষ্ট হয়। মুখে দুর্গন্ধ হয়। সাধারণত গ্রন্থির ফোলা কমতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। মাম্পস সাধারণত দেখেই বোঝা যায়।
চিকিৎসা
মাম্পসের চিকিৎসায় ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল বা অন্যান্য ব্যথানাশক এবং জটিলতাজনিত ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া বা কুলকুচি করা। প্রচুর পরিমাণ পানি পান করা। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার রোগীকে খেতে হবে। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে। কারণ মুখের ভেতর পরিষ্কার রাখতে হবে।
সঠিক চিকিৎসা না হলে এ থেকে পরে জটিলতা হতে পারে। মাম্পসের জটিলতার (complications) মধ্যে অন্যতম হলো মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং অন্ডকোষের প্রদাহ। উল্লেখ্য, টিকা শুরু হওয়ার আগে মস্তিষ্কের প্রদাহের অন্যতম কারণ ছিল মাম্পস। বড় ছেলেদের ক্ষেত্রে মাম্পস থেকে হতে পারে অন্ডকোষের প্রদাহ (Orchits)। সাধারণত একপাশের অ-কোষ আক্রান্ত হয়ে ফুলে ওঠে; লাল হয়ে যায়। অন্ডকোষের প্রদাহ হলে অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধও যোগ করে দেওয়া হয়।
মাম্পসের আক্রমণ প্রতিরোধ করাই গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চাকে সময়মতো এবং নিয়মমতো টিকা দিন। টিকার ব্যাপারে শিশুর টিকাদান কেন্দ্রের সহায়তা নিন। তাহলে আপনার শিশু মাম্পস থেকে মুক্ত থাকবে।