সেই নিবর্তনমূলক আইনের ধারা বাতিল করেন সাহাবুদ্দীন

সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের আমলে ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের পত্রিকা বন্ধ সংক্রান্ত ধারা বাতিল করা হয়। প্রকাশক-সম্পাদকের দায়িত্বশীলতা নির্ধারণের জন্য ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশরা ‘প্রেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অব বুকস অ্যাক্ট’ চালু করে। ১৯৩১ সালে হয় ‘প্রেস (ইমার্জেন্সি পাওয়ার্স) অ্যাক্ট। ১৯৬০ সালে আইয়ুব শাহি দুটি আইনকে এক করে ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অর্ডিন্যান্স’ (পিপিও) তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স আইনের কালো ধারাটি যুক্ত হয়। যে ধারা বলে পত্রিকার ডিক্লারেশন বা প্রকাশনার লাইসেন্স নিতে গেলে শর্ত সাপেক্ষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হতো। তিনি আবার চাইলে এর ডিক্লারেশনস বাতিলও করতে পারতেন।

যদিও বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব ওমর ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৎকালীন সময়ে সাংবাদিকদের দাবির ফলে পত্রিকা বন্ধ সংক্রান্ত ধারাটি বাতিল করা হলেও তা সঠিকভাবে করা হয়নি। যার কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো পত্রিকার ডিক্লারেশন দেওয়া হচ্ছে। যে যেভাবে পারে, সেভাবেই এটার অপব্যবহার করছে। এতে সাংবাদিকদের পেশাগত সংকট তৈরি হয়েছে। ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। পরিচয় দিতে পারছেন না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করা যাচ্ছে না। তবে সাহাবুদ্দীন আহমদ ওই সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধনীর যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে।  তিনজোটের রূপরেখার সেই আন্দোলনে সাংবাদিক সমাজও অংশ নেয়। সারা দেশে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ও এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকরা কাজ করবেন না মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। পরে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর সাংবাদিক সমাজের অনুরোধে সংবাদপত্রকে কালো আইন মুক্ত করার জন্য বিচারপতি মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। সিনিয়র সাংবাদিকরা এর সদস্য ছিলেন। কমিটির সুপারিশে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্টে তখন কিছু সংশোধনী অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা হলো, যাতে সরকার নিজে কখনো পত্রিকা বন্ধ করতে পারবে না। একই সঙ্গে পত্রিকার ডিক্লারেশন পেতে ঝামেলা পোহাতে হবে না এবং জেলা প্রশাসক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিক্লারেশন না দিলে প্রেস কাউন্সিল তা দিতে পারবে। পরে খালেদা জিয়া নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের এতদ্সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইন হিসেবে সংসদে পাস করান। এরপর সংবাদপত্র প্রকাশনার জগতে বিপ্লব ঘটেছিল।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম তপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ঘটেছিল। তিনজোটের যে রূপরেখা ছিল, সেখানে সংবাদপত্রের জন্য যে নিবর্তনমূলক আইন ছিল, সেটা তুলে নেওয়া একটা অঙ্গীকার ছিল রাজনৈতিক নেতাদের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সাহাবুদ্দীন আহমদ সেই দায়িত্বটা সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন।

১৯৭৩ সালের প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্টের ২০ ধারা অনুযায়ী, যদি সংবাদপত্রের মালিক বা প্রকাশকের নাগরিকত্ব বাতিল হয়, যদি তারা নৈতিক দুশ্চরিত্রতার কারণে শাস্তিপ্রাপ্ত হন, যদি কোনো আদালত তাদের পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ঘোষণা করে, যদি আর্থিক দৈন্যের কারণে নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশে ক্ষান্ত হন তবে পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করতে পারে সরকার। একই আইনের ২২ ও ২৩ ধারায় অননুমোদিত সংবাদপত্র বা সংবাদপত্রের সব কপি বাতিল করতে পারে এমনকি জব্দ করতে পারে সরকার। এসব কাজ সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ প্রকাশ বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া সংবাদ প্রকাশ করার কারণে কোনো সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিল করার ক্ষমতা সরকারের নেই।