প্রায় এক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষে নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলে সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছিল। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল ও পাঁচদলীয় বাম জোট মিলে তিন জোটের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সম্পাদনের কঠিনতম দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। শুধু সেই যুগসন্ধিক্ষণেই নয়, তারপরও বহুবার তিনি সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অবিচল আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে। আজকের বাংলাদেশে কি রাষ্ট্র কি রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্রমহ্রাসমান বাস্তবতায় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের গণতন্ত্রের শিক্ষা তাই বিশেষভাবে পাঠ করতে হবে। খ্যাতির শিখর থেকে সরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিনের নিভৃত জীবন শেষে অনন্য সাধারণ এই ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ যেন আজকের বাংলাদেশকে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেল।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তখন মাত্র ১০ মাসের শাসনামলে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কৃতিত্ব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে তিনি আবারও প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যান। এই শর্তেই তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং এজন্য সংবিধানে সংশোধনীও আনতে হয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যান। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। একুশ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সে-সময় সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি হতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু কোনো দলের মনোনীত হয়ে রাষ্ট্রপতি হতে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি শেষ পর্যন্ত রাজি হন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ শাসনামলের পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো মতভেদ হয়নি। তার পরামর্শেই আওয়ামী লীগ সরকার প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছিল। ফলে, বিচার প্রলম্বিত হলেও এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। আবার ১৯৯৯ সালে জননিরাপত্তা আইনে সাংবিধানিক কারণে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হলেও তিনি এজন্য প্রকাশ্যেই রাষ্ট্রপতি পদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে ছাড়েননি। সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক একটি প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করে নিতে নিরলসভাবে সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলের সঙ্গেই ভুল বোঝাবুঝি হলেও তিনি কখনোই কারও কাছে মাথা নত করেননি।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ছিলেন অষ্টম সংশোধনী সংক্রান্ত মামলার রায় প্রদানকারী অন্যতম বিচারক। যে রায়ের মাধ্যমে সামরিক সরকারের হাইকোর্ট বিভক্তিকরণের আইন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। দেশের শাসনতান্ত্রিক বিকাশের এটা এক মাইলফলক। এর আগে ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। যদিও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি সামরিক সরকার। সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের শাসনামলেই সংবাদপত্র প্রকাশনার ছাড়পত্র ও প্রকাশনা বাতিলের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন থেকে বাতিল করা হয়। এই আইনের সংশোধন বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নাম।
সাহাবুদ্দীন আহমদ এদেশের ইতিহাসে সেই বিরল ব্যক্তি যিনি দুই দফায় দুই বার প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালের নভেম্বরে মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর থেকে তিনি জনজীবন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। হয়তো তার দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণেই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, হয়তো তিনি নিজেই আর সামাজিকতায় ফিরতে চাননি। সে যাই হোক কেবল বিচারাঙ্গন আর রাজনীতিই নয় ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন সদা অনুসরণীয়। তিনি কখনোই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাননি। এমনকি জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও বিদেশে না গিয়ে চিকিৎসার জন্য গেছেন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। এটাও তার দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি আমাদের ধ্রুপদী প্রজন্মের এমন এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি যিনি একাধারে দেশের বিচারাঙ্গন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন, অনুসরণীয় কর্ম ও চারিত্রিক দৃঢ়তার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।