আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইউক্রেনের

অবরুদ্ধ মারিওপোল শহরে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে রাশিয়া যে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়েভ। ওই এলাকার মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আত্মসমর্পণসহ বেশ কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় ইউক্রেন সরকারকে। কিন্তু রাশিয়ার সব শর্ত পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে কিয়েভ এবং মারিওপোল প্রশাসন। এর আগে বিবৃতিতে রাশিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের পরিচালক কর্নেল-জেনারেল মিখাইল মিজিনেস্তভ ইউক্রেনীয় বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘অস্ত্র সমর্পণ করুন। যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে তাদের সবাইকে নিরাপদে মারিওপোল ছেড়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সোমবার (গতকাল) মস্কোর স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে মারিওপোলের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে বেসামরিকদের জন্য মানবিক করিডর খুলে দেওয়া হবে। এর আগে মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর ৫টা পর্যন্ত মানবিক করিডর নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার এবং অস্ত্র সমর্পণের সুযোগ পাবে ইউক্রেন।’ রাশিয়ার এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনীয় উপ-প্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশচুক জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আত্মসমর্পণ বা অস্ত্র জমা দেওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। আমরা ইতিমধ্যে রাশিয়াকে জানিয়ে দিয়েছি। আমি লিখেছি, আট পৃষ্ঠার চিঠি লিখে সময় নষ্ট না করে করিডর খুলে দিন। আমরা এ নিয়ে জাতিসংঘ ও আইসিআরসিকে অবগত করেছি। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি। এটি সচেতনভাবেই জিম্মি করা।’

রুশ সীমান্তের কাছাকাছি ইউক্রেনের মারিওপোল শহর। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু থেকে ইউক্রেনের যে কয়েকটি শহর মারাত্মক গোলাবর্ষণের মুখে, সেগুলোর মধ্যে মারিওপোল অন্যতম। শহরটির চার লাখ বাসিন্দার অনেকে আটকে পড়েছেন। খাবার, পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। শহরটিতে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ করছে বলে অভিযোগ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

এদিকে মারিওপোলের পর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সর্বাত্মক হামলা জোরদার করেছে রুশ বাহিনী। কিয়েভের পোডিলিস্কি জেলায় হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে চার বেসামরিক নাগরিক। নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে ইউক্রেনের জরুরি বিভাগ। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, পোডিলিস্কিতে রাশিয়া বোমা হামলা চালানোর পর একটি শপিং সেন্টারের পাশাপাশি গাড়িতে আগুন লেগে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে নিয়ন্ত্রণে ১১টি ইউনিট এবং ৬৩ জন দমকলকর্মী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শপিং সেন্টারের তৃতীয় এবং চতুর্থ তলায় ছড়িয়ে পড়ে আগুন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয় দমকল বাহিনীকে। রুশ হামলায় আগুন লাগার ছবি সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামে শেয়ার করেছেন কিয়েভের মেয়র এবং স্থানীয় পুলিশ। এদিকে ইউক্রেনের আরেক শহর সামিতে রুশ বাহিনী নতুন করে হামলা করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গভর্নর। সেখানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এখনো।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে দুই দেশের লড়াই ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ সূচনা করতে পারে। রবিবার সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি এসব কথা বলেন। পুতিনের প্রতি ইঙ্গিত করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আমি গত দুই বছরই আলোচনার পক্ষে ছিলাম। আমি মনে করি, আলোচনা ছাড়া আমরা এই যুদ্ধের ইতি টানতে পারব না।’ জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধের যদি ১ শতাংশও সুযোগ থাকে, আমাদের সেই সুযোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমাদের এটা করা উচিত। আমি আপনাকে শান্তি আলোচনার ফলাফল বলে দিতে পারি...।’

ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতির বাইরে তেল নিয়ে চলছে নতুন আন্তর্জাতিক রাজনীতি। তেলে রুশ-নির্ভরতা কমাতে কাতারের দ্বারস্থ হয়েছে জার্মানি। গত রবিবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জার্মানির অর্থমন্ত্রী হ্যাবেক। এ সময় তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষ করে জ্বালানি খাতে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। বার্লিনে জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, কাতারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। ওই মুখপাত্র বলেছেন, ‘যে সংস্থাগুলো অর্থমন্ত্রী হ্যাবেকের সঙ্গে কাতারে গেছে তারা এখন দেশটির কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে।’ অন্যদিকে পৃথক এক বিবৃতিতে কাতার জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে তারা জার্মানিকে গ্যাস সরবরাহ করতে চেয়েছে কিন্তু আলোচনা কখনই সুনির্দিষ্ট চুক্তির দিকে এগোয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি বলছে, নিজ নিজ বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোকে পুনরায় যুক্ত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি করতে তারা জার্মানির সঙ্গে সম্মত হয়েছে।