বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে কানাডার টরন্টোতে ‘পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক’ ফ্লাইট পরিচালনা করতে যাচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ ফ্লাইটটি টরন্টো যাবে। সাধারণ যাত্রীদের টিকিট উন্মুক্ত করা হলেও কেউ টিকিট পাচ্ছেন না।
বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই ফ্লাইটে টরন্টো যাবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সচিব, দুজন সাংসদ, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের কারও কারও পরিবারের সদস্যরাও যাচ্ছেন ওই ফ্লাইটে। ফ্লাইট পরিচালনা ও ভ্রমণকারীদের থাকা-খাওয়াসহ খরচ পড়ছে প্রায় ৮ কোটি টাকা।
বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের মাধ্যমে টরন্টো ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এই উড়োজাহাজে আসনসংখ্যা ২৯৮। সাধারণ যাত্রী পরিবহন না করে শুধু কর্মকর্তাদের নিয়ে ফ্লাইট টরন্টো গেলে বাকি আসনগুলো ফাঁকাই যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টরন্টোতে বিমানের অফিস ভাড়া নেওয়া, সেলস এজেন্ট নিয়োগ ও রুট পরিচালনার জন্য কানাডার পরিবহন সংস্থা ট্রান্সপোর্ট কানাডার সঙ্গে পরামর্শ করতে তারা সেখানে যাচ্ছেন।
কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, শুধু প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্যই তড়িঘড়ি করে টরন্টোর ফ্লাইটটি চালু করা হচ্ছে। আগামী জুনের আগে এই রুটে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করছেন।
বিমান সূত্র জানায়, দুই বছর আগে থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকলেও বিমানের বর্তমান প্রশাসন কাজের কাজ কিছুই করতে পারেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমানের এমডি জানান, টরন্টো ফ্লাইট চালু করা নিয়ে বিমান কর্মকর্তারা বৈঠকের পর বৈঠক করেছেন। কারা যাবেন তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
গত ৭ মার্চ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী, টরন্টোর যাত্রীদের তালিকায় বিমান প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, তার স্ত্রী শামীমা জাফরিন, মেয়ে তাররিমা রাহবার, সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন, প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মোহাম্মদ মোসাব্বির হোসাইন, মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সৈয়দ শরিফুল ইসলাম, বিমানের মহাব্যবস্থাপক মোক্তার হোসেন, উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। তা ছাড়া বিমানের এমডি ও সিইও আবু সালেহ মোহাম্মদ মোস্তফাসহ অন্তত ১৫ জন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা রয়েছেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ৫ কর্মকর্তাও আছেন এ তালিকায়।
এ বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বিমান প্রতিমন্ত্রীর সফরের খরচ আসবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে। আর বাকিদেরটা দেবে বেবিচক ও বিমান। তাদের শুধু টিকিটের খরচ দেবে বিমান। এর বাইরে যাদের পরিবার যাবে টিকিটসহ নিজেদের পুরো খরচ নিজেরাই বহন করবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উল্টোটা হচ্ছে। সবার খরচ বহন করছে বিমান। তিনি আরও বলেন, বিমানের এমডি ও সচিবের স্ত্রীর যাওয়ার কথা রয়েছে। তা ছাড়া বিমানের আরও দুই কর্মকর্তার স্ত্রী ও সন্তান যেতে পারেন। যাবেন আরও দুজন সাংসদ ও চারজন গণমাধ্যমকর্মী।
এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, সমালোচনা বেশি হওয়ায় ফেরার সময় হয়তো কিছু যাত্রী নিয়ে আসতে পারে বিমান।
গত ১৯ মার্চ বিমানের মহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ ঢাকা থেকে কানাডার টরন্টোতে একটি ‘পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক’ ফ্লাইট পরিচালনা করতে যাচ্ছে বিমান। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে বিমানের ঢাকা-টরন্টো রুটের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। যাত্রীরা বিমানের যেকোনো সেলস সেন্টার, বিমান কল সেন্টার ও বিমান অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সি থেকে ঢাকা-টরন্টো গন্তব্যে ২৬ মার্চ ফ্লাইটের টিকিট কিনতে পারবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২৬ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় বিজি৩০৫ টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। ফ্লাইটটি ২৭ মার্চ টরন্টোর স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৭টায় গন্তব্যে পৌঁছাবে। টরন্টো থেকে ফিরতি ফ্লাইট বিজি-৩০৬ ২৯ মার্চ স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় যাত্রা করে ৩০ মার্চ ঢাকায় স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ১২টায় পৌঁছাবে। যাত্রীদের কানাডার ভ্রমণ নির্দেশনা অনুসরণ করে ফ্লাইট ছাড়ার আগে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা পরীক্ষা করে নেগেটিভ সনদ সঙ্গে রাখতে হবে।
কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৫ মিনিটের মধ্যে যাত্রীরা টিকিট কাটার চেষ্টা করলে ‘সোল্ড আউট’ (বিক্রি শেষ) দেখায়। যাত্রীরা কল সেন্টারে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে জানানো হয়, সাধারণ যাত্রীরা এখনই টিকিট পাবেন না।
এর সত্যতা যাচাইয়ে বিমান কল সেন্টারের ০১৯৯০৯৯৭৯৯৭ নম্বরে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে যোগাযোগ করা হলে প্রতিনিধি শারমিন সুলতানা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২৬ মার্চের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। পরে যোগাযোগ করুন। পরবর্তী ফ্লাইট চলাচল শুরু হলে পেতে পারেন টিকিট।
বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকা-টরন্টো রুটে ভাড়া ধরা হয়েছে (ওয়ানওয়ে) ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা আর রিটার্নসহ ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম মাহবুব আলী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল এবং ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছিলাম। ২৬ মার্চ টরন্টো ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে জটিলতাগুলো সমাধান করে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হবে।’
একই কথা বলেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিইও ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ফ্লাইট চালু করতে আরও ১২ সপ্তাহ লাগতে পারে। “সবকিছু পর্যালোচনা” করতে টরন্টোতে ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। আশা করি নিদিষ্ট সময়ে ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে।’
বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বিমানে এখন যারা বড় বড় পদে আছেন, তাদের এভিয়েশন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই বললেই চলে। তারা সঠিক সময়ে কানাডার সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এমনকি কানাডার একটি চিঠির জবাবও সময়মতো দিতে পারেনি। ল্যান্ডিং অ্যান্ড ওভারফ্লাইয়িং পারমিশন, কমার্শিয়াল লাইসেন্স, বিজনেস প্লেস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ফুয়েল পারমিশন, জিএসএ নিয়োগ, ক্যাটারিং চুক্তিসহ আরও কিছু কাজ এখনো করা সম্ভব হয়নি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বিমানের টরন্টো ফ্লাইট চালু করায় আর্শ্চয হয়েছি। ৩০-৩৫ বছর ধরে এভিয়েশন নিয়ে কাজ করছি। এই সময়ে কখনো দেখিনি “বাণিজ্যিক পরীক্ষামূলক” ফ্লাইট। বিমান কেন এটি করল তা বুঝতে পারছি না। আর পর্যবেক্ষণ করতে এত লোক কানাডায় যেতে হবে কেন?’
আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী বলেন, ‘বিমান এখন আমলাতন্ত্রের দাপটে কোণঠাসা। বিমানের যারা সত্যিকার অর্থে এভিয়েশনে দক্ষ ও পেশাদার, তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। যে কারণে তারা গত দুই বছরেও টরন্টো ফ্লাইট চালুর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। এত লম্বা সময় পেয়েও টরন্টো ফ্লাইট চালু নিয়ে এখনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সেখানে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে সবগুলো চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই বছরে বিমান এখনো টরন্টোতে অফিস নিতে পারেনি। জিএসএ নিয়োগ দিতে পারেনি। জিএসএ নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের সুযোগ খুঁজেছে। যে কারণে কানাডার শীর্ষ কোম্পানিগুলো বিমানের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেনি। বারবার আরএফপি করে বিমান জিএসএ নিয়োগ দিতে পারেনি। এখানেই বিমানের দৈন্যদশা ফুটে ওঠে।’