শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হাতে পাওয়ার উচ্ছ্বাস

গতকাল বিজয়ী শিল্পী কলা-কুশলীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২০’। সাধারণত এই পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই পেয়ে থাকেন শিল্পীরা। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে গণভবন থেকে তিনি পুরো অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে। সেখান থেকে তিনি বিজয়ী শিল্পীদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন, দেশ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে চলচ্চিত্রের ভূমিকার কথা। বিনোদনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে সিনেমাশিল্পকে আবারও জাগ্রত করার জন্য নানা পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি স্মরণ করেন চলচ্চিত্রশিল্প আজকের অবস্থানে আসার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা।

এ বছর বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও একই মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এবার আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন কিংবদন্তিতুল্য দুই অভিনয়শিল্পী আনোয়ারা ও রাইসুল ইসলাম আসাদ। আনোয়ারা গুরুতর অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন তার মেয়ে অভিনেত্রী রুমানা রাব্বানী মুক্তি। এই প্রখ্যাত অভিনেত্রীর অসুস্থতার খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং তার জন্য সব ধরনের সহায়তার জন্য তিনি প্রস্তুত বলে জানান। রাইসুল ইসলাম আসাদ আজীবন সম্মাননা গ্রহণের পর তার দরাজ গলায় নাটকের সংলাপ বলে শোনান। দর্শক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীও তার পরিবেশনার প্রশংসা করেন। আসাদ তার অনুভূতি প্রকাশের সময় নিজের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন। তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনের যে প্রখ্যাতজনেরা হারিয়ে গেছেন, তাদের অবদানের কথা স্মরণ করেন।

এবার সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে যৌথভাবে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু প্রযোজিত ও রুম্মান রশিদ খানের রচনায় ‘বিশ^সুন্দরী’ এবং গাজী রাকায়েত ও ফরিদুর রেজা সাগর প্রযোজিত ‘গোর’। গাজী রাকায়েত একাই পেয়েছেন চারটি পুরস্কার। সেরা প্রযোজক, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা কাহিনীকার ক্যাটাগরিতে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন।

‘বিশ^সুন্দরী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতা হয়েছেন এই প্রজন্মের জনিপ্রয় চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ। তিনি পুরস্কার নিতে হাজির হন সন্তানসম্ভবা স্ত্রী ও মাকে সঙ্গে নিয়ে। তরুণ বয়সে এত বড় স্বীকৃতি পেয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘আমি গর্বিত। কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে গেল। আগামীতে আরও ভালো ছবি উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রইল।’

‘গোর’ ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন রোজলিন দ্বীপান্বিতা মার্টিন। তারা দুজনই উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। সেরা পাশর্^ অভিনেতার পুরস্কার গ্রহণ করেন গুণী অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু (বিশ^সুন্দরী চলচ্চিত্রের জন্য)। সেরা পাশর্^ অভিনেত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বার পুরস্কার গ্রহণ করলেন লাক্স তারকা অপর্ণা ঘোষ (গ-ি চলচ্চিত্রের জন্য)। সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় গায়ক বেলাল খান (হৃদয়জুড়ে চলচ্চিত্রের জন্য)। সংগীত শাখায় বাকি সব কটি পুরস্কার গেছে বিশ^সুন্দরী সিনেমার ‘তুই কি আমার হবি রে’ গানটির ঘরে। সেরা গীতিকার কবির বকুল, সেরা সুরসার ইমরান, সেরা গায়ক ও গায়িকা ইমরান ও দিলশাদ নাহার কনা। গায়িকা ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে বীর ছবির ‘ভালোবাসার মানুষ তুমি’ গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার ঘরে তুলে নিয়েছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সোমনুর মনির কোনাল। তিনি অনুষ্ঠানস্থল থেকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই পুরস্কার আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। এর পেছনে আমার বাবা আর মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।’

বাকি সব শাখার পুরস্কার নিতে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী ও কলা-কুশলীরা। পুরস্কার প্রদানের পর এবারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিও ছিল উপভোগ্য। নানা প্রজন্মের শিল্পীরা নাচে-গানে মুগ্ধ করে রেখেছেন দর্শকদের। সবচেয়ে নজর কেড়েছে চলচ্চিত্রের তিন প্রবীণ অভিনেত্রী রোজিনা, নূতন ও অরুণা বিশ^াসের নাচ। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এ আয়োজনের উপস্থাপক চিরসবুজ নায়ক ফেরদৌস ও চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। এ ছাড়া নাচের মাধ্যমে চিত্রনায়িকা শবনম, কবরী, ববিতা ও দিতিকে স্মরণ করেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা বিদ্যা সিনহা মিম, ইমন, সায়মন, তমা মির্জা, দীঘি ও পূজা চেরী। দেশের গানে নৃত্য পরিবেশন করেন সাদিয়া ইসলাম মৌ ও কবিরুল ইসলাম রতন। সংগীত পরিবেশন করেন ফোক ডিভা মমতাজ, রফিকুল আলম ও আবিদা সুলতানা দম্পতি, অনুপমা মুক্তি এবং প্রতীক হাসান। মজার মজার কৌতুক ও প্রশ্নে উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের বিনোদন দেন জনপ্রিয় দুই অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ও সাজু খাদেম। প্রয়াত শিল্পী ফকির আলমগীরের কণ্ঠ নকল করে তাক লাগান সাজু।