ডায়াবেটিস হওয়ার অনেকগুলো কারণ ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এবার নতুন একটি কারণ আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণায় পাওয়া ফল অনুযায়ী, কোনো সুস্থ মানুষের ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকেলাইন ফসফেটাস (আইএপি) কমে গেলে ডায়াবেটিস হয়। আইএপি কমে যাওয়া ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। যাদের শরীরে এই এনজাইম বেশি থাকে, তাদের তুলনায় যাদের কম থাকে, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ১৩ দশমিক ৮ গুণ বেশি। আর অল্পবয়সীদের মধ্যে যাদের অন্ত্রে এই এনজাইমটি দ্রুত কমতে থাকে, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি। গত পাঁচ বছরে ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৫৭৪ জন সুস্থ মানুষের ওপর গবেষণা করে ডায়াবেটিসের এ নতুন কারণ সম্পর্কে জানা গেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আবিষ্কারের তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষকরা বলছেন, নতুন আবিষ্কার হওয়া এ বিষয়টি ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বড় ভূমিকা রাখবে। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের অন্ত্রে এনজাইমটি কম ছিল এবং পরে তা বেড়ে গেছে, তাদের ডায়াবেটিস হয়নি। এনজাইমটি যাদের অন্ত্রে কম ছিল, তাদের ফাস্টিং সুগার বৃদ্ধির মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। এনজাইমের মাত্রা বেশি হলে স্থূলকায় ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস হয়।
এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বারডেম (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস), ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল ও সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে গত পাঁচ বছর ধরে এ গবেষণা পরিচালত হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ও বাডাসের উপদেষ্টা এবং বারডেমের ভিজিটিং অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো ও জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে একদল গবেষক ডায়াবেটিস হওয়ার নতুন কারণ আবিষ্কার করেছেন।
গবেষকরা বলেন, মানবদেহের অন্ত্রে থাকা ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকালাইন ফসফাটেস নামের এনজাইম টক্সিনকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে এনজাইমের ঘাটতি হলে অন্ত্রে অতিরিক্ত টক্সিন জমা হয় এবং এই টক্সিন রক্তে ঢুকে সিস্টেমিক প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে একদিকে যেমন ডায়াবেটিস হতে পারে, তেমনি ইসকেমিক হার্ট ডিজিজও হতে পারে।
গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, যাদের দেহে উল্লিখিত এনজাইমের পরিমাণ কম, তাদের এই এনজাইম খাওয়ানো হলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। বর্তমানে গবেষকরা এই এনজাইমটি তৈরির চেষ্টা করছেন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো বলেন, ‘মানবদেহের অন্ত্রে থাকা ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকালাইন ফসফাটেস নামে এক ধরনের এনজাইমের ঘাটতির কারণে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এই এনজাইম মূলত দেহ থেকে টক্সিন বা বিষক্রিয়া অপসারণে কাজ করে। যাদের দেহে এই উৎসেচকের পরিমাণ কম, তাদের ডায়াবেটিস হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ‘যাদের আইএপি কমে যায়, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এ আবিষ্কারের ফলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও বড় কাজ করতে সক্ষম।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশ্বে ৪৬ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে বাংলাদেশে আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগী ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ১৯৫৬ সাল থেকে দেশে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এ সময় আরও বলা হয়, গত কয়েক দশক ধরে অন্য গবেষকরা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, ডায়াবেটিসের প্রত্যক্ষ কারণ হলো টক্সিন নিয়ন্ত্রিত নিম্ন গ্রেডের সিস্টেমিক প্রদাহ। যার ফলে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইনসুলিনের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস হয়।
মানবদেহের অন্ত্রে থাকা মৃত ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের অংশ টক্সিন হিসেবে কাজ করে। এই টক্সিন সাধারণত মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, তবে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, ফ্রুকটোজ বা অ্যালকোহল টক্সিনকে রক্তে ঢুকতে সহায়তা করে। এর ফলে নিম্ন গ্রেডের সিস্টেমিক প্রদাহের সৃষ্টি হয়ে ডায়াবেটিস হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ও আমেরিকান ডায়াবেটিস সমিতির যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত জার্নাল ‘দ্য বিএমজে ওপেন ডায়াবেটিস রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার’-এ প্রকাশ হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো এর আগে মানবদেহে থাকা ইন্টেস্টিনাইল অ্যালকালাইন ফসফেটাস নামের এনজাইমটি পরিমাপের লক্ষ্যে স্টুলভিত্তিক টেস্ট পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এনজাইম স্বল্পতার কারণে একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আছে কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব।