ইউক্রেনের কয়েকটি শহরে সর্বাত্মক হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। মারিওপোল ও কিয়েভে সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক রুশ বাহিনী। আরও কয়েকটি শহরে স্থল ও আকাশপথে হামলার বাইরেও সমুদ্র থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে রুশ হামলার একপেশে সংবাদ ও ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের বিজয়গাথা প্রকাশ করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিনই ইউক্রেনের তৈরি করা ফ্রন্টলাইন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে রুশ বাহিনী। ফলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ভিডিওবার্তায় আর্তনাদ করতে দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন আর ন্যাটোর সদস্য হতে চায় না এমনটাই বারবার বলছেন জেলেনস্কি।
রুশ বিমানের নিক্ষেপ করা বোমা আঘাত হেনেছে রাজধানী কিয়েভে। গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, রুশ বোমা হামলায় কিয়েভে পাঁচজন আহত হয়েছে। কিয়েভ শহরে এখনো রুশ বাহিনীকে দেখা যায়নি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি ইউক্রেনে পরমাণু হামলা চালাবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী? এর উত্তরে মস্কো বলছে, রাশিয়া তখনই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে যদি তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি বাসভবন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যে ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না এ বিষয়ে তিনি (পেসকভ) ‘প্রত্যয়ী বা আত্মবিশ্বাসী’ কিনা, সিএনএনের ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরের এমন প্রশ্নের উত্তরে দিমিত্রি পেসকভ একথা বলেন।
ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি প্রেসিডেন্ট পুতিন বিবেচনা করছেন কিনা সিএনএনের এই প্রশ্নের জবাবে দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার একটি নিয়ম আছে এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার সব কারণ আপনি সেখানে পড়তে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুতরাং এটি (অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা) যদি আমাদের দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়, তবে এটি (পারমাণবিক অস্ত্র) আমাদের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারি।’
পেসকভের এমন বক্তব্যের পর নড়েচড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ আইনজীবীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এখানেই থামছে না যুক্তরাষ্ট্রের রুশবিরোধী পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন এবার জি-২০ জোট থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। আগামী নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত হবে জি-২০ সম্মেলন। ওই সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্টের যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মস্কো। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিনের এমন আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত লুডমিলা ভোরোবিভা। তিনি বলেন শুধু জি-২০ নয়, অনেক সংস্থাই রাশিয়াকে বহিষ্কারের চেষ্টা করছে। পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এদিকে কূটনীতিকের বেশে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজের সন্দেহে রুশ ৪৫ কূটনীতিককে বহিষ্কার করছে পোল্যান্ড। বুধবার পোল্যান্ডের বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি রাশিয়ার ওই কূটনীতিকদের বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে পোল্যান্ডে নিয়োজিত কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। পোল্যান্ডের বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থার মুখপাত্র স্টানিসল জারিন সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ৪৫ জনকে শনাক্ত করেছে; যারা রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তারা পোল্যান্ডে কূটনীতিকের মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, রুশ ওই কর্মকর্তাদের তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় রাশিয়ান ফেডারেশনের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিরাও রয়েছেন। কূটনীতিকের বেশে এই কর্মকর্তারা রাশিয়ার গোয়েন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় করে পোল্যান্ড এবং তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কাজ করতেন।
রুশ আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা রয়েছে এমন ন্যাটো বাহিনী পূর্ব ইউরোপে স্থায়ীভাবে মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছে এস্তোনিয়া। বৃহস্পতিবার (আজ) ন্যাটো সম্মেলনের আগে এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি জোনাতান ভেসিভিয়েভ বলেন, ইউরোপ এবং ন্যাটো জোট আর কোনো দিনই ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে না। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটো জোটে এস্তোনিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি জোনাতান ভেসিভিয়েভ বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ নতুন এক নিরাপত্তা পরিবেশে থাকব। নতুন ইউক্রেন হবে। নতুন রাশিয়া হবে। নতুন ইউরোপ হবে। ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।’
প্রসঙ্গত, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইউক্রেনে এই হামলা শুরু করে। সর্বাত্মক হামলা শুরুর পর এক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির বহু শহর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এছাড়া হামলার শুরুর মাত্র চার দিনের মাথায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পরমাণু প্রতিরোধ বাহিনীকে বিশেষ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন পুতিন।