যুদ্ধের সময় আমি ক্লাস এইটে পড়ি; ১৬ বছরের এক কিশোর। পড়তাম পুরান ঢাকার আহমেদ বাওয়ানী স্কুলে। স্কুলে বিহারি ছাত্রছাত্রীই বেশি ছিল। আমরা হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালি ছাত্র ছিলাম। বিহারিরা সবসময় আমাদের সঙ্গে ঝগড়া করত, আমাদের নিচু দেখানোর চেষ্টা করত। তাদের সঙ্গে সবসময় আমাদের একটা দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। খেলাধুলায়ও আমাদের সঙ্গে তারা কখনোই পারত না।। তখন আমি বাবুবাজার থাকতাম। আমার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে গেলাম। ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তানিরা ঢাকায় আক্রমণ করে তখন আমরা কেরানীগঞ্জে আমার নানা বাড়িতে চলে আসি। এখানে আসার পর আহসানউল্লাহ নামে একজনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। তখন আমরা দুজন সারা দিন বুদ্ধি-পরামর্শ করতাম কীভাবে কী করা যায়। আগানগরে মিটিং-মিছিল করতাম। এলাকার মুসলিম লীগের নেতারা পাকিস্তানিদের তথ্য দিত এলাকায় তরুণ ছেলেমেয়ে কোন কোন ঘরে আছে। ওদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পাকিস্তানিরা বিভিন্ন বাসায় অত্যাচার করত। মূলত রাজাকাররা না থাকলে পাকিস্তানিরা আমাদের এত ক্ষতি করতে পারত না। ওদের সহযোগিতা নিয়েই পাকিস্তানিরা আমাদের বেশি ক্ষতি করেছে।
আমি আহসানউল্লাহ আর খালেক তিনজনে মিলে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। বাসার কাউকে কিছু না বলে মার জন্য একটা চিঠি লিখে ১৩৫ টাকা হাতে নিয়ে বাসা থেকে ভারতের উদ্দেশে বের হই। বাসার কেউ কল্পনাও করেনি ১৬ বছরের একটা ছেলে যুদ্ধে চলে যাবে। বাসা থেকে বের হয়ে সদরঘাট থেকে কুমিল্লার রামচন্দ্রপুরের উদ্দেশে রওনা হই। সেখানে মহসীন নামে এক লোকের কাছে যাই। মহসীন কুমিল্লা থেকে বর্ডার পর্যন্ত যাওয়ার জন্য একটা দালাল ঠিক করে দিল। বর্ডার যখন ক্রস করছিলাম তখন বৃষ্টি ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই বর্ডারের পাশে থাকা পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়। আমরা সাঁতরে কোনোমতে বর্ডার ক্রস করলাম। সেখান থেকে আমরা ভারতের শ্রীধর ভিলা গেলাম। সেখানে রহিম ভাই একরাম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। রাস্তায় কখন খেয়েছি, কখন খাইনি তার ঠিক নাই। মাইলের পর মাইল হেঁটেছি, পা ফুলে গেছে হাঁটা বন্ধ করিনি। শ্রীধর ভিলা থেকে আমাদের হাপানিয়া ক্যাম্পে পাঠাল। সেখানে পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। আমি লম্বা-চওড়া সুন্দর ছিলাম। ওরা ভাবল আমি বাঙালি না পাঠান। তাই আমাকে নিতে চাইল না। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পরে নিল। আমরা ছয়জন গেলাম মেলাঘর থেকে ট্রেনিং করার জন্য। ট্রেনিংয়ের সময় আমাদের খাবারের কষ্ট দিয়েছে ইন্ডিয়ান আর্মিরা। ইন্ডিয়ান সরকার আর্মিদের জন্য যে খাবার বরাদ্দ করেছিল আমাদের জন্যও একই। কিন্তু আমাদের খাবার ঠিকমতো দিত না আর্মিরা। বিক্রি করে ফেলত আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার। এখানে আমাদের গেরিলা ট্রেনিং দেওয়া হয়। ১৯ দিন ট্রেনিং করার পর আমাদের বাঘমারা সেন্টারে পাঠানো হলো ট্রেনিংয়ের জন্য। সেখানে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন অস্ত্র পেয়ে যুদ্ধের জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠলাম। তখন আমাদের সব অস্ত্র রেখে মেলাঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ৫০ মাইল হেঁটে কাঁধে কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে আমরা মেলাঘরে আসলাম। সেখান থেকে আমাদের আবার পালোটোনা ক্যাম্পে পাঠাল। আমরা তখন ৩০০ জনের মতো ছিলাম। পালোটোনা ক্যাম্পে আমাদের ঢুকতে দিচ্ছিল না। আমরা দুদিন ধরে ক্ষুধার্ত ছিলাম। ক্ষুধার জ¦ালায় টিকতে না পেরে জোর করে পালোটোনা ক্যাম্পের রসদ ঘরে ঢুকে যে যা পাই খেয়ে নিই। এ কারণে ইন্ডিয়ান আর্মিরা আমাদের অনেককে শাস্তিও দেয়। সেখানে বেশ কিছুদিন ট্রেনিং শেষ করার পর আবার মেলাঘর আসি। তখন মেলাঘরের দায়িত্বে ছিলেন হায়দার ভাই। আমি ছোট থাকায় সবাই আমাকে আদর করত অনেক। বিশেষ করে হায়দার ভাইয়ের অনেক প্রিয় ছিলাম। এরপর মেলাঘর থেকে আমাদের অস্ত্র দেওয়া হলো। আমাদের ২১ জনের গ্রুপ ছিল। ২১ জনের জন্য ১১টি স্ট্যানগান, এসএলআর ৮টি, থ্রি নট থ্রি, গ্রেনেড, মাইন দিল। অস্ত্র দেওয়ার পর আমাদের বলে দিল মৃত্যুর আগপর্যন্ত তোমাদের হাতের অস্ত্র কাউকে দেবে না। এটা তোমাদের কাছে দেশের জন্য আমানত। খেয়াল রাখবা সবাই যার যার অস্ত্রের। অস্ত্র পাওয়ার পর রাতে আমরা ক্যাম্পে ঘুমিয়ে গেলাম। আমাদের ঘুমের সুযোগে ক্যাম্পের দায়িত্বরতরা আমাদের অস্ত্র নিয়ে গেল। সকালে অস্ত্র না পেয়ে তাদের জানাই, জানাতেই তারা আমাদের বলল দায়িত্ববোধ আছে কি না দেখার জন্যই অস্ত্রগুলো তারা নিয়ে গেছে। আমাদের পানিশমেন্ট দিয়ে আবার অস্ত্র দিয়ে দেয়। সেদিন মনে মনে ঠিক করি, যে পর্যন্ত আমার শ্বাস চলবে, অস্ত্র কোনোভাবেই হাত থেকে রাখব না। ভারত সরকার যুদ্ধের সময় যে সহযোগিতা করেছিল, তা না করলে আমরা স্বাধীনতা পেতে অনেক সময় লাগত, অনেক দুরূহ ছিলে। এরপর বাংলাদেশে আসি। ঢাকা আসার পথে কয়েক দফা যুদ্ধ হলো পাকিস্তানিদের সঙ্গে। এরপর আমরা নবাবগঞ্জে আসলাম। নবাবগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় আমরা যুদ্ধ করলাম। নবাবগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জে এসে রামেরকান্দায় মোস্তফা মহসীন মন্টুর সঙ্গে জয়েন্ট হলাম। এরপর কেরানীগঞ্জে যতগুলা অপারেশন করেছি মন্টু ভাইয়ের নেতৃত্বেই। তখন সারা কেরানীগঞ্জে দুই থেকে আড়াইশো মুক্তিযোদ্ধা ছিল। এখন তো তালিকায় দেখছি অনেক নাম।
যুদ্ধের দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছি খাবারের। পচা ভাত খেতে হতো, ভাতের মধ্যে পোকা থাকত। পানি দিয়ে পোকা ফেলে ভাত খেতাম। কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে কাটাতাম। কখনো ক্ষেতের কাঁচা সবজি খেয়েছি। একবার এক বুড়ো মা আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি মুক্তি? আমরা বললাম হ্যাঁ। তিনি ঘর থেকে আমাদের জন্য মুড়ি নিয়ে আসলেন। বললেন, তোমরা খাও বাবা পেট পুরে। উনার ঘরে ঢুকে দেখলাম ভেতরে একটি খাট আর মুড়ির পোটলা ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। বড় যুদ্ধটা করলাম সৈয়দপুর, তুলশি খালি ব্রিজের কাছে। সেদিন আমরা ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। আর পাকিস্তানি বাহিনী ছিল ১৫০ জনের বেশি। আল্লাহ নিজ হাতে সেদিন আমাদের রক্ষা করেছিলেন। এরপর ১৬ তারিখ যুদ্ধ শেষ হলো। সেদিন বিকেলে আমরা কেরানীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় যাই। ঢাকায় বঙ্গভবনে গিয়ে দেখি সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন লুটপাট করছে। আমরা গিয়ে তাদের কাছ থেকে সব জিনিস নিয়ে নিই এবং বঙ্গভবন নিয়ন্ত্রণে নিই। তিন দিন আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পর বঙ্গভবনের দায়িত্ব আমরা ক্যাপ্টেন মালেক ও ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের কাছে বুঝিয়ে দিই। আমারা কেরানীগঞ্জের যোদ্ধারা সেদিন নিয়ন্ত্রণে না নিলে বঙ্গভবনের সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যেত। বঙ্গভবন মূলত আমরা কেরানীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারাই রক্ষা করেছি।
লেখক : কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের বাসিন্দা