চার ইস্যুতে সমঝোতা!

ইউক্রেনে রুশ বিশেষ অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত পাঁচবারের বেশি বৈঠকে বসেছে মস্কো ও কিয়েভ। বৈঠকগুলো থেকে মানবিক করিডর ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইউক্রেনের পাঁচটির বেশি শহরে এখন মানবিক করিডর দিয়েছে রাশিয়া। এই করিডরের আওতায় লাখ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছাড়ছে। শরণার্থী হিসেবে যারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই যাচ্ছেন পোল্যান্ডে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউক্রেনের এই বিশালসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক অবস্থা নেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা।

মধ্যস্থতায় এখন পর্যন্ত অনেকটাই এগিয়েছে তুরস্ক। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে তুরস্ক। উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেই তুরস্কের যোগাযোগ রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন যে, ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধ অবসানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। দুই দেশের মধ্যে মূল ৬টি বিরোধের মধ্যে ৪টির বিষয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিউজউইক। এরদোয়ান জানান, যে চারটি ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে যুদ্ধরত ইউক্রেন ও রাশিয়া; সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যাটো, আংশিক নিরস্ত্রীকরণ, সম্মিলিত নিরাপত্তা ও রুশ ভাষা। এর ফলে দেশ দুটি যুদ্ধ অবসানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একাধিকবার বলেছেন যে, ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার আর কোনো ইচ্ছে নেই তার দেশের। তিনি এখন শুধু যুদ্ধবিরতি চান। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন চাইছেন নিশ্চয়তা। কারণ, ১৯৯০ সাল থেকে ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদ দেখে আসছে রাশিয়া। একাধিকবার পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোকে পূর্বাঞ্চলে সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল রুশ প্রশাসন। কিন্তু প্রতিবারই সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করে ন্যাটো। উল্টো প্রতি বছরই নতুন নতুন দেশকে জোটভুক্ত করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনও ন্যাটোর সদস্য হতে যায়।

মিডল ইস্ট আইর তুরস্ক ব্যুরোপ্রধান রাজিপ সয়লু শুক্রবার সকালে সমঝোতার বিষয়টি টুইটারে উল্লেখ করেছেন। তবে ক্রিমিয়া ও ডনবাস অঞ্চল নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। পূর্ব ইউক্রেনের এই দুটি অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে রাশিয়া। ২০১৪ সালে রুশ সেনারা ক্রিমিয়াকে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে। মস্কো কৌশলগত দিক দিয়ে ডনবাস ও লুহানস্ককে নিজেদের অংশ করতে চাইছে। কারণ তা করা গেলে ক্রিমিয়ার সঙ্গে সংযোগের জন্য সেতু নির্মাণ করতে পারবে রাশিয়া। এতে ক্রিমিয়াকে রাশিয়া তাদের অর্থনৈতিক জোনভুক্ত করতে পারবে। তাই তো ইউক্রেনে বিশেষ অভিযান শুরু করার আগেই ডনবাস ও লুহানস্ককে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া।

তুরস্কের সংবাদমাধ্যম হুরিয়েত ডেইলি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এরদোয়ান রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে পরামর্শ দেবেন ‘ইউক্রেন থেকে সম্মানজনক প্রস্থান’ এবং ‘শান্তির রূপকার’ হওয়ার জন্য। তবে এ নিয়ে মস্কোর কোনো প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার সকালে ব্রাসেলসে ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা ও পূর্ব ইউরোপে জোটের উপস্থিতি জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শুক্রবার বাইডেন ইউক্রেন সীমান্তের কাছে পোল্যান্ডের একটি শহর পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংহতি ও পশ্চিমা সংকল্পের বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে তার এই সফরের উদ্দেশ্য রাশিয়াকে আরও একটু চাপে রাখা এবং পোল্যান্ডে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের মনোবল বাড়াতে ভূমিকা রাখা।

ইউরোপকে রুশ গ্যাসমুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইইউর চুক্তি : রাশিয়ার গ্যাসের ওপর ইউরোপের দেশগুলোর যে নির্ভরশীলতা তা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার চুক্তি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইউরোপ সফরের মধ্যেই এ চুক্তির ঘোষণাটি এলো বলে জানিয়েছে বিবিসি।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরই ইইউকে অতিরিক্ত দেড় হাজার কিউবিক মিটার গ্যাস দেবে। ইউক্রেনে মস্কোর সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই রাশিয়ার গ্যাসে ইউরোপের নির্ভরশীলতার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। ইউরোপের গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই রাশিয়া মেটায়। যে কারণে ইউক্রেনে রুশ অভিযানের পাল্টায় ইইউ মস্কোর ওপর অনেক ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিলেও গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। জোটটি অবশ্য রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যার অর্থ, ইউরোপকে এখন আমদানি বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে জোর দিতে হবে।

এদিকে, রাশিয়ার গ্যাসের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমাতে গতকাল শুক্রবার এক বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। ইউরোপকে বাড়তি ১৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার তরল গ্যাস চলতি সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা কাজ করবে বলে জানিয়েছে এএফপি।

রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর ইতিমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছিল তেল-গ্যাসকে নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখতে। জার্মানি গতকাল জানিয়েছে, তারা রাশিয়া থেকে গ্যাস কেনা কীভাবে কমানো যায় তার সম্ভাব্য প্রত্যেকটি উপায় খতিয়ে দেখছে। আগামী জুন নাগাদ রাশিয়া থেকে কেনা তেলের পরিমাণ অর্ধেক করতে চাইছে দেশটি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও চলতি বছরের শেষের মধ্যে রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত তেল-গ্যাস দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ইউরোপকে রুশ গ্যাস-তেলমুক্ত করতে কাজ করবে টাস্কফোর্স। প্রসঙ্গত, ইউরোপে এখন বছরে ৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস চাহিদা রয়েছে। এর সিংহভাগই আসে রাশিয়া থেকে।