ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বেপরোয়া আক্রমণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমারা ক্রেমলিনের ওপর তাদের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রয়োগ করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে রাশিয়া চলতি হিসাবে রেকর্ড উদ্বৃত্ত দেখার মাত্র এক মাস পরই খেলাপি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে নিষেধাজ্ঞা (বা আরও সঠিকভাবে বললে তা আরোপের হুমকি) মূলত একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করত। বস্তুত, পুতিন তার আগ্রাসন শুরু করার আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালেই পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর বর্তমানের কঠোর নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা দিয়েছিল। ওইসব হুমকির লক্ষ্য ছিল একটি ধ্বংসাত্মক সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা ছাড়াই পুতিনকে দেখানো যে, তিনি ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করলে বড় ধরনের মূল্য চুকাতে হবে। হুমকিগুলো এখন সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে পুতিন আপাতদৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, ইউক্রেনীয়দের বশীভূত করার জন্য তিনি রাশিয়ার জনগণকে কষ্ট দিতেও প্রস্তুত।
প্রকৃতপক্ষে, পুতিনকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নিবৃত্ত করা যায়নি। কঠোর নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট হুমকির পরও তিনি ইউক্রেন আক্রমণ করেছেন। এ কাজে পুতিন এমন মাত্রার সংকল্প দেখিয়েছেন যা খোদ রাশিয়ার প্রভাবশালী ধনকুবের মহলসহ প্রায় সব পর্যবেক্ষকের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি জেপি মরগান ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১২ শতাংশ সংকুচিত হবে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ১৫ শতাংশ সংকোচনের বিষয়ে সতর্ক করেছে। আর রাশিয়ান প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাকাডেমি অব ন্যাশনাল ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জঅঘঊচঅ) অধ্যাপক ইলিয়া মাতভিভের মতে, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পতন অসম্ভব নয়। রাশিয়ার মানুষের জীবনযাত্রার মান ১৯৯০ এর দশকের শেষ পর্যায়ের স্তরে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এবং এখনো আরও কমতে পারে। রাশিয়ার অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত। তবুও জবরদস্ত সেনা লাইনের আড়ালে তার দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে থাকলেও পুতিন ঠিকই হামলায় অনড় রয়েছেন। এর পরেও অবশ্য পশ্চিমের অনেকেই এখনো নিষেধাজ্ঞাকে কার্যকর প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ উপমন্ত্রী ওয়ালি অ্যাডেইমো সিএনবিসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে-রকমই ইঙ্গিত দেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন ‘পুতিনের সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া বা উত্তেজনা কমানো। যতক্ষণ হামলা অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ নিষেধাজ্ঞাও চলবে।’ অ্যাডেইমো বাড়তি পদক্ষেপ হিসেবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিলেন। বাণিজ্য ও নৌচলাচলের অবরোধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সেরকমই অনুরোধ করেছিলেন।
নিষেধাজ্ঞা এখন পর্যন্ত পুতিনকে নিরস্ত করতে স্পষ্টভাবে ব্যর্থ। কাজেই শান্তি স্থাপনে ঠিক কীভাবে এ কৌশলকে ব্যবহার করা যেতে পারে তা যাচাই করা দরকার। শাসন পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নিষেধাজ্ঞা? অনেকে মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা শাসক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে শান্তি আনতে পারে। কিন্তু এ যুক্তির পেছনের রেকর্ডটা মোটেই ভালো নয়। শুধু ইরান, ভেনিজুয়েলা বা কিউবার দিকে তাকালেই চলবে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞাগুলোকে শাসক পরিবর্তনে উৎসাহিত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হলে দীর্ঘমেয়াদে হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, নিষেধাজ্ঞাগুলো সময় সময় তুলে নেওয়ার বা সমন্বয় করা প্রস্তাবগুলো নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশের মধ্যে অত্যন্ত রাজনৈতিক চরিত্রের হয়ে ওঠে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস এর একটি উদাহরণ। রাশিয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলস এখনো শাসন পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন, তাদের লক্ষ্য ‘পুতিন শাসনের পতন’ ঘটানো। মুখপাত্র পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, তিনি ভুল করে কথাটি বলেছেন। তবে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী জেমস হিপ্পি দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার কাছে অনুরূপ দাবি করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা এই সংঘাতের পরেও বহাল থাকবে।’ পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শাসকের পরিবর্তনকে বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে দেখুক আর না-ই দেখুক, নিষেধাজ্ঞা থেকে আসা বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় পুতিনের শাসনের পতন ঘটাবে বলে মনে করার কারণ খুব একটা নেই।
গোপন পুলিশ, মানবাধিকারের প্রতি বিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় অতি আগ্রহ এবং ভিন্নমতকে চূর্ণ করার অতীত রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, পুতিন এমনকি তার দেশের এক নতুন উত্তর কোরিয়ার মর্যাদাকেও স্বাগত জানাতে পারেন। একটি একঘরে থাকা রাষ্ট্রের নেতা হিসেবেও সমৃদ্ধ হতে পারেন তিনি।। পুতিনকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর শীর্ষ কর্তাদের ছোট দলটিও তার বিরোধিতা করে নিষেধাজ্ঞা থেকে দেশকে মুক্ত করার চেষ্টা করবে এমনটা মনে হয় না।
বেশি আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ক্ষতিকর হতে পারে
শাসক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করার কৌশল হিসেবে নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তবে তার অর্থ এটাও নয় যে, ক্রেমলিনের তরফ থেকে কোনো নীতিগত পরিবর্তন ছাড়াই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত। মানতেই হবে এ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা পুতিনকে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু রুশ বাহিনী ইউক্রেনে থাকতেই তা প্রত্যাহার করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার হুমকি চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়বে। এটি প্রতিবন্ধক হিসেবে এর কার্যকারিতা আরও কমিয়ে দেবে। নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক উপায়ে যুদ্ধের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটি অবশ্যই ‘পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব’ থেকে অনেক বেশি পছন্দনীয় যা বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এড়িয়ে এসেছে। জার্মানি এবং জাপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তখন তাদের নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি বলা যায়, যুদ্ধের পথে তাদের যাত্রা আরও ত্বরান্বিত করেছিল। তারপরও মানতে হবে নিষেধাজ্ঞা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আগের চেয়ে বেশি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অন্তত মার্কিন অস্ত্রভা-ারে। এ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারেরই প্রাধান্য।
সামনের পথ কোনদিকে
নিষেধাজ্ঞাগুলো পুতিনকে ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ বন্ধে সক্ষম না-ও হতে পারে। তবে রাশিয়া এবং এর জনগণের জন্য এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি। প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার সামরিক শিল্পকে পঙ্গু করে দেবে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞার অর্থ হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য পক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা শেষ। রাশিয়ার অর্থনৈতিক পতনের নিঃসন্দেহে নানা রাজনৈতিক পরিণতি থাকবে। তবে ক্রেমলিনের বেহিসেবি মিডিয়ার কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টার কারণে সেই দুর্দিনেও জনমত সরকারের পক্ষে যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা সাধারণ রুশদের ক্ষতি করবে। উদাহরণস্বরূপ, বলা যায়, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রকদের বাধাগুলোর কারণে রাশিয়ার জন্য আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করা খুব কঠিন করে তুলবে। ইতিমধ্যেই দেশটিতে আমদানি করা ওষুধের ঘাটতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার এসব প্রভাবকে রাশিয়া তার এ দাবির সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে যে, পশ্চিমারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আসলে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছে। তাই রাশিয়া ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে কীভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যায় পশ্চিমাদের জন্য তার একটি রূপরেখা তৈরি করা খুব জরুরি। এটি পুতিন দেশবাসীর ওপর যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছেন তা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তার ওপর সাধারণ মানুষ এবং অভিজাত শ্রেণির চাপ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। রুশদের কাছে মানবিক সরবরাহ এবং মৌলিক খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করার জন্যও পশ্চিমাদের জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া বিদেশের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রুশদের বিতাড়িত করার পরিবর্তে পাশ্চাত্যের উচিত তাদের সাদরে স্বাগত জানানো। রাশিয়ার জব্দ তহবিল এবং সম্পদও রুশ জনগণের সুবিধার জন্য সংরক্ষিত করা উচিত। নিষেধাজ্ঞা এখন পর্যন্ত একটি ‘লাঠি’ হিসেবে কাজ করেছে যা পুতিনকে বশ্যতা স্বীকার করাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন যেহেতু রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে আর ইউক্রেনের যুদ্ধও অব্যাহত, তাই লোভ দেখাতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে গাজরের মতো নাকের সামনে ঝুলানো ছাড়া আর কী করার আছে! তবে সেটাও ব্যর্থ হতে পারে। আগ্রাসনের সাজা হিসেবে জনগণকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি সে পথেই হেঁটেছেন। কাজেই তিনি জনগণের কষ্ট উপশম করার জন্য শিগগিরই এটি শেষ করার উদ্যোগ নেবেন এমন সম্ভাবনা কম। তবে চেষ্টা করলে কী আর ক্ষতি হবে! বারবার একই কাজ করে যাওয়া আর ভিন্ন ফল আশা করার চেয়ে অন্তত এটি অবশ্যই ভালো। ধীরে ধীরে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা এবং দেশটিতে চিকিৎসা ও মানবিক সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা সহজতর করা এটাই প্রমাণ করবে যে আমাদের মূল্যবোধ সত্যিই সর্বজনীন। রাশিয়ার নাগরিকরা এমন একজন লৌহমানব ধরনের শাসক পেয়েছেন যিনি তাদের মঙ্গলের জন্য ভাবিত নন। তবে নিষেধাজ্ঞা নীতিতে একটু রদবদল এনে আমরা দেখাতে পারি রাশিয়ার সরকারের আচরণ যাই হোক, বিশ্বসমাজ দেশটির সাধারণ মানুষের কথা ভাবে।
আল-জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
লেখক লন্ডনভিত্তিক ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর ফেলো ও ‘পলিটিক্যাল রিস্ক’ বিষয়ক পরামর্শক