সংগ্রামী ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবক

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৪ এএম

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। তিনি এরশাদের আমলে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। তার পরিবারের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একসময়ের স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজ। ১৯৪৭-এর পর ‘গণতন্ত্রী দল’ নামে একটি বামপন্থি বিরোধী দল গঠিত হয়েছিল। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম ছিলেন মির্জা গোলাম হাফিজ। মির্জা নুরুল হুদা কাদের বক্স ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একজন শ্রদ্ধেয় আপনজন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন তুখোড় বক্তা, চিন্তাশীল তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক বিশ^াসের প্রতি অনড় ভাবাপন্ন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্মাণে, তার এসব ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক আত্মীয়দের বিরাট প্রভাব ছিল। গোড়াতে তার পিতা মুসলিম লীগপন্থি হলেও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে বিশ^াস করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় মির্জা ফখরুলের পিতা মির্জা রুহুল আমিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে নিকটাত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবারের নারী সদস্যদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তবুও তাকে একটি গোষ্ঠী স্বাধীনতাবিরোধী বলে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াসের চেষ্টা করে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যান। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। পূর্বসূরি ছাত্র ইউনিয়ন সদস্যদের মেধা, সাংস্কৃতিক পরিশীলতা এবং আদর্শিক দৃঢ়তা তাকে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করে। ‘অর্থনীতি’র মতো কঠিন বিষয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক কাজে মির্জা আলমগীর প্রচুর সময় ব্যয় করতেন। এ সময় সংগঠনের রাজনীতির প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার, অচিরেই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠন এনএসএফের চক্ষুশূলে পরিণত করে। সলিম উল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র মির্জা আলমগীর, একই হলের ওয়েস্ট হাউজে ১৭৬ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার কক্ষসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, প্রফেসর আহমেদ কামাল ও ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (পরবর্তীকালে বিএনপি নেতা এবং তারও পরে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতা)। বিরোধী ছাত্র সংগঠনের অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী হওয়ায় এনএসএফের পান্ডারা মির্জা আলমগীরের বইপত্র ও বিছানাপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিল। এনএসএফের অত্যাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এক সময় মির্জা আলমগীর ও আহমেদ কামাল করাচি বিশ^বিদ্যালয়ে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন।

অর্থনীতিতে অনার্স পরীক্ষা চলার সময় মির্জা আলমগীর পরীক্ষা ভালো ফল করবেন না ভেবে পরীক্ষা ড্রপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আমি ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমিও সলিম উল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র। যখন জানতে পারলাম, মির্জা আলমগীর পরীক্ষা ড্রপ করতে চলেছেন, তখন আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, পরীক্ষা ড্রপ করা সঠিক হবে না। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে আমি কীভাবে তার পিতার নিকট জবাবদিহি করব! আমি তাকে বোঝাই যে, কিছুতেই পরীক্ষা ড্রপ করা চলবে না। এরপর তাকে পরবর্তী দিনের পরীক্ষার বিষয়ে, রাত দুইটা-আড়াইটা পর্যন্ত সব পাঠ্যসূচির ওপর একটা সাধারণ ব্রিফিং দিই। তখন সেই আলোচনার প্রত্যেকটি পয়েন্ট তিনি নোটবুকে টুকে নেন। পরদিন পরীক্ষা দেন এবং পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেন। এ গল্পটি তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ম্যাগাজিনে, পরম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। সাংগঠনিক যোগ্যতার কারণে মির্জা আলমগীর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের একপর্যায়ে তিনি ও আহমেদ কামাল করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন ও আন্দোলন-সমাবেশে যোগ দেন। ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের সময় যখন প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, তখন ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে মধুর ক্যান্টিনে আল-আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে একটি সভা হয়। সেই সভা থেকে মির্জা আলমগীর সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা সেøাগান দিতে দিতে ও কমরেড দেবেন সিকদারের মুক্তির দাবি করে কলা ভবনের সামনে চলে আসেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল করিম এই দাহ প্রক্রিয়া থেকে ছাত্রদের বিরত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ছাত্রজীবনে মির্জা আলমগীর ছিলেন এক নির্ভীক সংগ্রামী কর্মী। তার দেশপ্রেম ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি ছিল ছাত্রজীবনের আদর্শিক শিক্ষা। ছাত্রজীবন শেষে মির্জা আলমগীর ঢাকা কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপনা করেছেন। প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা এস এ বারী এটির একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনের নিশ্চিত নিরাপত্তা ছেড়ে, জনকল্যাণে তিনি রাজনীতিতে সরাসরি যোগ দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পর্যায়ক্রমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

তথাকথিত এক-এগারোর সময়, তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। বেগম খালেদা জিয়া অ্যাডভোকেট খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিএনপির মহাসচিব নিযুক্ত করেন। তিনি প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে এক-এগারোর অসাংবিধানিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হলে দলটিকে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে ধরে রাখেন। তার মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। তার এই নিয়োগে আমি, আমার প্রয়াত কনিষ্ঠ ভ্রাতা মাহফুজ উল্লাহ ও বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বিশেষ ভূমিকা রেখেছি। আমাদের বক্তব্য ছিল, সেই মুহূর্তে বিএনপির জন্য প্রয়োজন একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন মহাসচিব। বেগম খালেদা জিয়া আমাদের বক্তব্যের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। মির্জা আলমগীরও সেই আস্থার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখেছিলেন। তারপর বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে তিনি ভারমুক্ত হয়ে পরিপূর্ণ মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। রাজনীতিতে তাকে একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে অনেক পরিশ্রম ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াও তার প্রতি দৃঢ় আস্থা পোষণ করতেন সবসময় এবং যেকোনো জটিল অবস্থায়।

শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে মির্জা আলমগীরকে অসংখ্যবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অজস্র মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তিনি ধৈর্যচ্যুত হননি। আত্মবিশ্বাস হারাননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অম্লানবদনে সব ধরনের অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করে। ভগ্ন স্বাস্থ্য সত্ত্বেও কখনো হাল ছেড়ে দেননি। চব্বিশের মহান গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হতে বিএনপির সাড়ে ১৫ বছরের সংগ্রাম একের পর এক গণপ্রতিরোধের ইস্টক গেঁথে চলেছিল। আল্লাহতায়ালার পরম ইচ্ছায়, জাতির বুক থেকে বহু শহীদের আত্মত্যাগ ও অঙ্গহানির মূল্যে ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছে। সব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ঐক্য অটুট রেখে শেখ হাসিনার শাসনামলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, দুঃশাসনের সেই দিনগুলোতে মনোবল না ভেঙে সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। 

জনগণের ক্ষোভে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার থেকে বিতাড়িত হয় আওয়ামী লীগ সরকার, তার আগের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপির মধ্যে বড় ধরনের ফাটলের চেষ্টা করেছিল। এর ফলে যে ফলাফল একদম শূন্য হয়েছিল, তা নয় কয়েকজনকে বিভ্রান্ত করে তারা সফল হয়েছিল। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে কোনো লাভ হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুকঠিন নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ঠিকই অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যায়। এরপর অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে বিএনপি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে।    

ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়েক দিন পর রাজনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে যাচ্ছে। সন্দেহাতীতভাবে ধরে নেওয়া যায়, আগামী ২০ আগস্ট মির্জা আলমগীরই হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। এরপর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে পরিবৃত হবেন তিনি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে, তার তুলনাহীন সাফল্যে দেশবাসী আনন্দিত ও গর্বিত। বহুদিন পর দেশের মানুষ ন্যায়পরায়ণ, আদর্শবাদী ও দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রপতি পেতে যাচ্ছে। এরচেয়ে মঙ্গলময় আর কী হতে পারে! আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। আশা করি, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি অকুতোভয়ে সংবিধান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন। প্রত্যাশা থাকল, তিনি দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়ে, দলীয় নয় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে।

লেখক : জাতীয় অধ্যাপক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত