রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি’র নিরীক্ষিত প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ

মুনাফায় বড় ধরনের উত্থান-পতনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানির নিরীক্ষিত প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সিলেট বিভাগের ১২টি চা-বাগান নিয়ে কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম চললেও মুনাফায় থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ন্যাশনাল টি কর্তৃপক্ষকে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুই হিসাব বছরে টানা লোকসান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি হিসাব বছরের অর্ধবার্ষিক পর্যন্ত কিছুটা মুনাফায় থাকলেও কোম্পানির সম্পদের তুলনায় খুবই কম।

এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানির গত ১০ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশেষ নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বিশেষ নিরীক্ষার জন্য গত ২৪ মার্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করেছে এসইসি। বিপুল পরিমাণের সম্পদ থাকার পরও নামমাত্র মুনাফায় থাকা ন্যাশনাল টি কোম্পানির ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১০ বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের এসইসির চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ নিরীক্ষা করতে হবে নিরীক্ষককে।

২০২০-২১ হিসাব বছরে ন্যাশনাল টি কোম্পানি তার অধীনস্ত ১২টি চা-বাগান থেকে ৫৬ লাখ ৯৭ হাজার কেজি চা উৎপাদন করে। তবে ওই সময়ে চায়ের মূল্য বেশি পেলেও শ্রমমজুরি, বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের ব্যয় বাড়ায় বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়ের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হয়। ফলে লোকসানে পড়ে কোম্পানিটি। ওই বছরে কোম্পানিটি প্রতি কেজি চা বিক্রি করে ১৭৯ টাকায়, যেখনে প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন ব্যয় হয় ২১৫ টাকারও বেশি। আগের হিসাব বছরেও একই কারণে লোকসানে ছিল কোম্পানিটি।

এসইসির সিদ্ধান্তে বিশেষ নিরীক্ষায় ন্যাশনাল টি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিতকরণ, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অডিটরদের ভূমিকা, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণের সত্যতা যাচাই, বিশেষ নিরীক্ষক কোম্পানির আগের লভ্যাংশ ঘোষণার প্রবণতা এবং নীতির সঙ্গে ব্যাংকঋণের বাইরে লভ্যাংশ ঘোষণার প্রাসঙ্গিকতাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ নিরীক্ষক পরিচালন ব্যয় (বিশেষ করে বেতন ও মজুরি, পারিশ্রমিক), কর্মচারী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী এবং  বোর্ডের অন্য সদস্যদের দেওয়া সুবিধাগুলো তদন্ত করে দেখবে। এছাড়া জৈবিক সম্পদ, ভবন ও অন্যান্য নির্মাণ এবং অন্যান্য স্থায়ী সম্পদ সম্পর্কে অনুসন্ধান করবে বিশেষ নিরীক্ষক।

বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- ন্যাশনাল টি  কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যালেন্স শিট এবং আর্থিক বিবৃতির সম্পদ, দায় (ব্যালেন্স শিট দায়বদ্ধতাসহ), ইক্যুইটি এবং উপার্জনের সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অন অডিটিং (আইএসএ) অনুযায়ী যথাযথভাবে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে কি-না তা দেখতে হবে। বিশেষ নিরীক্ষক প্রাসঙ্গিক সমর্থনসহ বিলম্বিত কর নির্ধারণের সম্ভাব্য উপায়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করবে। কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। বিশেষ নিরীক্ষক ২০১৬ সালের ৩০ জুন হওয়া হিসাব বছর পর্যন্ত এবং পরবর্তী হিসাব বছরের তুলনামূলক আর্থিক কর্মক্ষমতা নির্ণয় করতে হবে।

কোম্পানিটির প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্ট্যাটুটরি অডিটর এবং কমপ্লায়েন্স অডিটরের ভূমিকাও পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ নিরীক্ষক কোম্পানিটির স্থায়ী সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জন্য কোম্পানির নীতি পরীক্ষা করবে এবং সম্পদের সম্ভাব্য অবচয় ও তার স্থায়িত্বকাল পর্যালোচনা করবে। কোম্পানির ব্যবহারিক ক্ষমতা এবং গত কয়েক বছরের জন্য পরিচালন নগদ প্রবাহ পর্যালোচনা করবে। চারা রোপণসহ সব সম্পদের তথ্য সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি-না তা যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। বিশেষ নিরীক্ষক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ব্যাংকঋণের তথ্য তদন্ত করবে।

বিশেষ নিরীক্ষক কাঁচামাল সংগ্রহ, বিক্রয় পণ্যের মূল্য এবং আমদানির বিষয়টি তদন্ত করবে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের নথির প্রমাণ শনাক্ত করবে। কোম্পানির সামগ্রিক পরিচালনায় পরিচালনা পর্ষদ, অডিট কমিটি, মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), কোম্পানি সচিব, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রধানসহ শীর্ষ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা যাচাই করবেন। এছাড়া বর্তমান সম্পদের সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করবে।