‘বানর’ শব্দটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর আত্মজীবনী লেখক স্ট্যানলি ওলপার্টের ভাষ্যে, এক দিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল-হককে রাগতস্বরে চিৎকার করে ডেকে ভুট্টো বলেছিলেন, ‘এদিকে এসো, বানর।’ সেদিন ভুট্টোর ডাকে তাকে ‘স্যার’ বলেই সাড়া দেন জিয়া-উল-হক। কিন্তু ঘটনার পরিক্রমায় ১৯৭৭ সালের গ্রীষ্মে সেই জিয়া-উল-হক তার সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন, প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে তার বাসভবন থেকে বের করে দিতে। এরপর থেকে পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে জেনারেলরা সর্বেসর্বা। তারাই ঠিক করেন রাষ্ট্রক্ষমতায় পছন্দের ‘বানর’ কে হবে?
২০১৮ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসেন দেশটির তুমুল জনপ্রিয় ক্রিকেটের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান। ওই নির্বাচনে বিরোধীরা ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনলেও ধোপে টেকেনি। সবকিছু সামলে নিজ দপ্তর চালাতে মনোযোগী না হয়েই ইমরান খান বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতার নেতিবাচক চর্চা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায়, গত বছর অক্টোবরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ইমরানের। ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) ডিরেক্টর জেনারেল ফায়েজ হামিদের জায়গায় লেফটেন্যান্ট নাদিম আনজুমকে বসানো নিয়ে ওই দ্বন্দ্বের শুরু। বলা হয়, ইমরানের নির্বাচন জেতানো মেকানিজমে জেনারেল ফায়েজ হামিদের হাত ছিল। ঘটনার নির্মম পরিহাস, সেনাপ্রধানের সঙ্গে ওই দ্বন্দ্বের কয়েক মাস যেতে না যেতেই আজ ইমরান খানের মসনদ টলমলে। তার বিরুদ্ধে বিরোধীরা পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো বক্তব্যই দেওয়া হচ্ছে না। সেনাবাহিনীর এ নিষ্ক্রিয়তাকে বিরোধীরা চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছেন। আর বেপরোয়া ইমরান খান তার পার্টির সমর্থকদের রাজধানীতে গতকাল রবিবার জড়ো করে নিজের আসন রক্ষার ‘শেষ চেষ্টা’ করতে চাইছেন।
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যতই ‘শক্তি’ প্রদর্শন করছেন, ততই তার সামনে একের পর এক দুঃসংবাদ আসছে। অনাস্থা প্রস্তাবে তার নিজের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) একগাদা এমপি বিদ্রোহ করেছেন। তাদের কাছে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। তারা তার জবাবও দিয়েছেন। কিন্তু ভোটদানে বিরত থাকবেন না। আবার ইমরান খানকেও ভোট দেবেন না। এরই মধ্যে নতুন খবর, গতকাল সকালে ইমরান খান যখন ‘ইতিহাস গড়ার’ ডাক দিয়েছেন, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে ইমরানের বেলুচিস্তান পুনরেকত্রীকরণবিষয়ক বিশেষ সহকারী পদত্যাগ করেছেন। তিনি হলেন জামুরি ওয়াতান পার্টির নেতা শাহজান বুগতি। গতকাল সকালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর কারণ হিসেবে তিনি নিজের প্রদেশে উন্নয়নে ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে পাশে নিয়ে রাজধানী ইসলামাবাদে সংবাদ সম্মেলনে তার এ ঘোষণাকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খানের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতার অভিযোগে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে চলেছেন তিনি। তার পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী নির্বাচনের দাবিতে দেশটির পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও মুসলিম লিগ (নওয়াজ) আন্দোলন করে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৮ মার্চ দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে এ দুটি দলের অংশগ্রহণে ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। সেখানে ইমরানের উদ্দেশে বিরোধীরা দাবি তোলে ‘হয় পদত্যাগ করুন, নয়তো অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হোন’। এছাড়া ইমরানের নিজ দলের সদস্যরাও তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট দিতে চলেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ডনের প্রতিবেদনে।
অনাস্থার মুখোমুখি ইমরান খান : পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে গত ৮ মার্চ ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেয় বিরোধী দলগুলো। সেই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির জন্য তা গত শুক্রবার দেশটির জাতীয় পরিষদে (পার্লামেন্ট) উত্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু প্রস্তাবটি জাতীয় পরিষদে উত্থাপন না করতেই আজ সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার আসাদ কায়সার। দেশটির সংবিধান অনুসারে, প্রস্তাব পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্পিকার অধিবেশন ডাকতে বাধ্য। আজ এই ১৪ দিনের মেয়াদ শেষ হবে। তবে জাতীয় পরিষদের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের সূত্র উল্লেখ করে দ্য ডন জানিয়েছে, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার ৩০ বা ৩১ মার্চ পর্যন্ত অধিবেশন স্থগিত করতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন স্থগিত করা নিয়ে তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।
দৃশ্যপটে নেই অর্ধশত মন্ত্রী : এদিকে গতকাল ইসলামাবাদের প্যারেড গ্রাউন্ডে সমাবেশ করেছে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এ সমাবেশকে ‘পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধের দিন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এ সমাবেশকে ঘিরে ইমরান খান বলেছেন, ‘আমরা পিটিআইকে বাঁচাতে রাস্তায় আসিনি, পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ করতে নেমেছি।’ এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, ইমরান খান হেলিকপ্টারে করে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হয়েছেন। এ সময় গোটা এলাকায় কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষ জমায়েত হয় বলে জানিয়েছে ডন।
পিটিআইয়ের গতকালের সেই সমাবেশকে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের শক্তি প্রদর্শনের মহড়া হিসেবে দেখছেন দেশটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কিন্তু এরই মধ্যে পিটিআইয়ের অন্তত ৫০ জন মন্ত্রী রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে উধাও বলে গুঞ্জন উঠেছে দেশটিতে। দেশটির পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির ঠিক অন্তিম মুহূর্তের এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা অন্যকিছুরও আভাস দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, দেশটির বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি তোলার পর থেকেই কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের এ মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না। পত্রিকাটি লিখেছে, দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের অনুপস্থিতি এ বার্তা দিচ্ছে যে, তারা হয়তো বিকল্প কিছু ভাবছেন, হয়তো সঠিক সময়ে মুখ খোলার অপেক্ষায় আছেন।
প্রসঙ্গত, নিজ দলের জোট ও বিক্ষুব্ধ নেতাদের পূর্ণ সমর্থন না পেলে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) অর্থাৎ ইমরান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। নিম্নকক্ষে তাদের আসন ১৫৫টি, যা ক্ষমতায় থাকতে প্রয়োজনীয় ১৭২ আসনের চেয়ে কম। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিকদের আসন প্রায় ১৬৩। অনাস্থা ভোটে পিটিআই ছেড়ে যাওয়া নেতারা তাদের সঙ্গে যোগ দিলেই প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়ে বসবেন ইমরান। বিরোধীরা মনে করেন, ৩৪২ সদস্যের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে অনাস্থা ভোটে ইমরান খানকে হারানোর মতো প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে তাদের। ইমরানকে অনাস্থা ভোটে হারাতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। ইমরানকে হটাতে পিটিআইয়ের ভিন্ন মতাবলম্বী সদস্য ও ক্ষমতাসীন জোটের অসন্তুষ্ট সদস্যরা ভোটের সময় বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।