রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম কাজীপাড়া এলাকায় ছুরিকাঘাতে এক দন্ত চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার ভোরে রাস্তা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আহমেদ মাহী বুলবুল (৩৮) নামের ওই চিকিৎসককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। তিনি গরীবের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পুলিশের ধারণা, ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। বুলবুলের স্ত্রী মিরপুর মডেল থানায় অজ্ঞাত পরিচয়ের আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, আহত বুলবুলকে প্রথমে স্থানীয়রা আল হেলাল হাসপাতালে নেয়। পরে সেখান থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
মর্গ সূত্রে জানা গেছে, ডা. বুলবুলের পায়ের উরুতে একটা আঘাত ছাড়া আর কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশের ধারণা, অটো রিকশায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয়েছে বুলবুলের। তবে নিহত ডা. বুলবুলের কাছে থাকা ১২ হাজার টাকা ও একটি মুঠোফোন অক্ষত থাকায় স্বজনদের অভিযোগ এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-।
ডা. বুলবুলের স্ত্রী শাম্মী আক্তার শান্তি জানান, খুব ভোরে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সাড়ে ৮টার দিকে তার বাবার মাধ্যমে বুলবুলকে হাসপাতালে নেওয়াও হয়েছে বলে জানতে পারেন। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি লাশ দেখতে পান। শান্তি বলেন, ‘এটি কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকা-। তাই মিরপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে মিরপুর মডেল থানার ওসি মুস্তাজিজুর রহমান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ডা. বুলবুলের বাড়ি রংপুরের কোতোয়ালি থানা এলাকার ভোগিবালা পাড়ায়। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৯৯ সালে রংপুর ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ডেন্টাল সার্জনের ডিগ্রি লাভ করেন। স্ত্রী, ৬ বছরের মেয়ে ও ২ বছরের ছেলেকে নিয়ে থাকতেন মিরপুর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার আনন্দ বাজার এলাকার ১১৮/এফ নম্বর বাসায়। রাজধানীর মগবাজারের ‘রংপুর ডেন্টাল’ নামের একটি চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখতেন তিনি। সেখানে তিনি দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতেন।
দন্ত চিকিৎসার পাশাপাশি ঠিকাদারিও করতেন ডা. বুলবুল। গতকাল ভোরে ঠিকাদারির কাজের জন্য নোয়াখালীর সোনাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
ডা. বুলবুলের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসার তত্ত্বাবধায়ক জহির গাজী জানান, ফজরের আজানের পর তাকে ফোন করে গেট খুলে দিতে বলেন ডা. বুলবুল। পরে তিনি একাই বাসা থেকে বের হন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডা. বুলবুলের বাসা থেকে বের হয়ে এক কি.মি. দূরে মূল সড়ক। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ওই এলাকায় মেট্রোরেলের ৩০৫ নম্বর পিলার রয়েছে। ফার্মগেটের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা থাকলেও তার লাশ পাওয়া যায় উল্টো দিকে প্রায় এক কি.মি. দূরে ২৭৮ নম্বর পিলারের স্টেশনের পাশে।
ডা. বুলবুলের সঙ্গে নোয়াখালী যাওয়ার কথা ছিল সোহরাব নামের এক রংমিস্ত্রির। তিনি ছিলেন মহাখালী এলাকায়। সোহরাব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোর রাত সাড়ে ৪টার দিকে স্যার (ডা. বুলবুল) আমাকে ফোন করে বলেন ফার্মগেট চলে আসতে। সেখান থেকে আমাদের নোয়াখালীর সোনাপুরে একটি রঙের কাজের জন্য যাওয়ার কথা ছিল। এর আগেও অনেকবার স্যারের সঙ্গে কাজের জন্য ঢাকার বাইরে গিয়েছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাহতাব উদ্দিন গতকাল রবিবার দুপুরে তার নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নোয়াখালী যাওয়ার জন্য ভোরে শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বের হন ডা. বুলবুল। তিনি তার সহকারীকেও ফোন করেছিলেন, তবে তার সহকারী তখনো পৌঁছাননি। ভোর সোয়া ৫টার দিকে ২৭৮ নম্বর পিলারের কাছে ওয়ানওয়ে টাইপের অন্ধকার ঘিঞ্জি জায়গায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। এ-সময় রাস্তা ফাঁকা ছিল। ছিনতাইকারীদের বাধা দিলে তার ডান পায়ের উরুতে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা। এর পরই তারা চলে যায়। আহত অবস্থায় আশপাশের মানুষের সহায়তায় আল হেলাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে যাওয়ারও অনেক পরে তিনি মারা যান।
ডিসি আরও বলেন, আমরা জানতে পেরেছি তিনজন ছিনতাইকারী এ হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি। যে রিকশায় তিনি যাচ্ছিলেন তার চালককে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ছিনতাইকারীর কবলে পড়লে মোবাইল মানিব্যাগ কেন নিল না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোবাইল মানিব্যাগ নেওয়ার সময় পায়নি তারা। এখন এটা ছিনতাই নাও হতে পারে। অন্য ঘটনাও হতে পারে। ঘটনা যেটাই হোক এটা আমরা বের করব।
বুলবুলের শ^শুর মো. ইয়াকুব আলী গতকাল মিরপুর মডেল থানায় এ প্রতিবেদককে বলেন, কোনোভাবেই এটি ছিনতাইয়ের ঘটনা মনে হচ্ছে না। পূর্বশত্রুতা অথবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছি।
ডা. বুলবুলের বন্ধু মাহবুব রতনও বলেন, এটি ছিনতাইয়ের ঘটনা বলে আমরা মনে করছি না। ছিনতাই হলে টাকা, মানিব্যাগ ও ফোন কেন নিল না।