একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত মৌলভীবাজারের বড়লেখার দুই আসামি আবদুল আজিজ ওরফে হাবুল ও আবদুল মতিন দুজনই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেছে আসামিপক্ষ। তারা বলছে, ভারতের লাল মুক্তিবার্তা এবং বাংলাদেশ সরকারের এ সংক্রান্ত গেজেটে দুজনের নাম রয়েছে। তবে আসামিপক্ষের এ দাবি অস্বীকার না করে প্রসিকিউশন পক্ষ বলছে, দুজন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরলেও পরে রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিলে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত হয়। স্থানীয় প্রশাসন সেখানকার রাজাকারদের যে তালিকা করেছে তাতে দুজনেরই নাম রয়েছে। তাদের অপরাধের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। যুক্তিতর্কের এ পর্যায়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য খণ্ডন করে ৭ এপ্রিল প্রসিকিউশন পক্ষকে লিখিত বক্তব্য দিতে বলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল রবিবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দিয়ে ওইদিন যুক্তিতর্কের পরবর্তী দিন ঠিক করে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্যমতে, এ মামলার আসামি আবদুল আজিজ, আবদুল মতিন ও আবদুল মান্নান ওরফে মনাইসহ তিনজন। এর মধ্যে আজিজ ও মনাই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। মতিন পলাতক। আজিজ ও মতিন সহোদর।
আজিজের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান। পলাতক মতিনের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে তিনিই শুনানি করেন। প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল ও সাবিনা ইয়াসমিন খান। মনাইয়ের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সারোয়ার হোসেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বড়লেখায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আজিজ, মতিন ও মনাইয়ের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এর মধ্যে আজিজ ও মতিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের চারটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। ২০১৮ সালের ৭ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে একই বছরের ১২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্কের শুনানি শুরু হয় ২০২১ সালের ৩ মার্চ। প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আসামিপক্ষ শুনানি শুরু করে ওই বছরের ১২ আগস্ট। তবে কভিড পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় শুনানি বন্ধ থাকে। গতকাল আসামিদের পক্ষে আবারও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাদের আইনজীবী।
শুনানিতে আসামি আজিজ ও মতিনের আইনজীবী দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একই বছরের এপ্রিলে আজিজ ও মতিন ভারতে প্রশিক্ষণ নেন। পরে দেশে ফিরে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এর সপক্ষে বিভিন্ন সনদ উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ভারতের লাল মুক্তিবার্তায় আজিজের নম্বর ২৭৩৭৪। মতিনের ২৭৩৮৫। আর বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধাসংক্রান্ত গেজেটে আজিজের গেজেট নম্বর ৫৯৭। মতিনের ১৯৪২। আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটি সঠিক নয়। ১৯৭২ সালে ধর্ষণের যে মামলাটি করা হয়েছিল সেখানে ধর্ষণের কোনো ধারা উল্লেখ না থাকলেও পরবর্তীকালে মামলার নথিতে ধর্ষণের ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের করা রাজাকারদের তালিকায় আজিজ ও মতিনের নাম রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তেও তাদের নাম এসেছে। এ দুজন ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, সেটি আমরা অস্বীকার করছি না। এ তথ্য গোপন করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তারা দেশে ফিরে রাজাকারদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এমনকি যেসব মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এ দুজন ছিলেন তাদের বাড়িঘর তারা পুড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার-নির্যাতন করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই আসামির বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালেই মামলা হয়েছিল। ভারত থেকে যে তালিকা এসেছিল সেখানে তাদের নাম থাকলেও তারা কাজ করেছেন রাজাকারের। তারা (আসামিপক্ষ) যেসব তথ্য উপস্থাপন করেছেন এর বিরুদ্ধে আগামী ৭ তারিখে (৭ এপ্রিল) আমাদের লিখিত বক্তব্য দিতে বলেছেন ট্রাইব্যুনাল।’
অ্যাডভোকেট পালোয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুজনের সব সনদ আমরা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও যাদের সঙ্গে তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সেসব প্রত্যয়নপত্রও দাখিল করেছি। এ দুজন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত নন। আদালত আমাদের বক্তব্য শুনে শুনানি মুলতবি করে ৭ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন। যুক্তিতর্কে আমরা যা বলেছি ওইদিন প্রসিকিউশন পক্ষকে তা খণ্ডন করতে হবে।’