দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাদশ সংসদের ১৭তম অধিবেশনের প্রথম দিনই উত্তপ্ত হয়েছে সংসদ। পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এ বিষয়ের অবতারণা করলে বিতর্ক হয়।
গতকাল সোমবার মুজিবুল হক চুন্নু পয়েন্ট অব অর্ডারে নিজে বাজার যাওয়ার দাবি করে বলেছেন, জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব বাজারে না গিয়ে বাজার যাওয়ার দাবি করছেন।
এ সময় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ এবং বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সদস্য রুমিন ফারহানা দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এ বিতর্কের সময় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
পয়েন্ট অব অর্ডারের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে চুন্নু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, যারা দেখে না তাদের চোখ নষ্ট। তাদের ডাক্তার দেখাতে হবে। না, প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছি আমরা দেখতে পাচ্ছি উন্নয়ন হচ্ছে, অনেক কিছুর। কিন্তু আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের হাহাকার অবস্থা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন নিত্যপণ্য অনেক আছে। অভাব নেই। তারপরও সমস্ত জিনিসের দাম বাড়ছে। শুধু তাই নয়, খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ খাদ্যÑ প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্য গুদামে মজুদ আছে। আমার প্রশ্ন, তারপরও চালের মূল্য এত বেশি বৃদ্ধি পেল কী কারণে?’ চুন্নু বলেন, ‘আমি নিজেও বাজারে যাই। বাজারে গেলে মনে হয় না, সরকার আছে। মনে হয় না কোনো প্রকার সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে।’
জাপা এমপি এ সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘এই যে বিদ্যুতের বিষয়টি আমার এলাকা করিমগঞ্জ-তারাইলে গত কয়েক দিন ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। বাকি ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। এই গরমে অসম্ভব কষ্টের মধ্যে আছি। বিদ্যুৎমন্ত্রীকে বলব আমার কথা নোট করেন, দেখেন সত্য কি না?’
চুন্নুর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দাবি করেন, এক কোটি মানুষকে কার্ড দেওয়ার পর বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমেছে। চুন্নু সংসদে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন দাবি করে তাকে উদ্দেশ্য করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বাজারে যান বলেছেন। আপনি আসলে বাজারে যান না। আমি বাজারে যাই। এই এক কোটি মানুষকে কার্ড বিতরণের পর অনেক পণ্যের দাম কমে গেছে। তেলের দাম কমেছে প্রতি লিটারে ১০ টাকা। পেঁয়াজের দাম বেড়ে গিয়েছিল এখন কমে হয়েছে ৩০ টাকা। আপনি এখানে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন।’
হাছান মাহমুদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির মহাসচিব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন আজকে করোনার কারণে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মূল্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে। রুটির দাম ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৃদ্ধি পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এক কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং সেই কার্ডের ভিত্তিতে প্রতি পরিবারে পাঁচজন করে পাঁচ কোটি মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে খাদ্যপণ্যের দাম অনেক কমে গেছে।’
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে নিত্যপণ্য বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু সেখানে চাল, ডাল, খেজুর, তেল ও চিনি এসব পণ্য একই সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু একজন গরিব মানুষের খেজুর বা ছোলা দরকার না থাকলেও তাকে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ কাজে সরকারের মাঠ প্রশাসন এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে মনোনিবেশ করতে পারছে না।’ এছাড়াও তিনি নির্মাণসামগ্রী দাম বেড়ে যাওয়ার সমালোচনা করে বলেন, ‘রড ও সিমেন্টসহ সব জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণকাজ মুখ থুবড়ে পড়ছে।’