সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি

আমাদের এই ভূখন্ডের মানুষই ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তির অভিপ্রায়ে ভোট প্রদান করেছিল। সর্বসাধারণের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা জুড়ে ছিল সম্প্রদায়গত বিভক্তিতে গঠিত নতুন রাষ্ট্রে তাদের সার্বিক অধিকার-মর্যাদা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণ। সেই লক্ষ্যেই পূর্ববাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের যে বিজাতীয় পাঞ্জাবি দুঃশাসনের কবলে পড়তে হবে, তেমন পরিণতি নিয়ে ভাবার অবকাশ পর্যন্ত ছিল না। তখন অবিভক্ত বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় পরস্পরকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের পরিবর্তে প্রতিপক্ষ এবং শত্রুরূপে গণ্য করেছে। ছেচল্লিশে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টির মূলে ছিল মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালন। যার নেতৃত্বে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কলকাতার দাঙ্গা ক্রমেই বাংলাসহ বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিণতিতে হিন্দু-মুসলিমের সুদীর্ঘকালের সম্প্রীতি সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়।

ব্রিটিশের বিদায়ে ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রধান দুই কুশীলব কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ দেশভাগের রাজনৈতিক পাশা খেলার চালে ভুল করেনি। দল দুটির কাক্সিক্ষত লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলা ভাগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ মুসলিম এবং ৪৮ শতাংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘুর টানাপড়েনও হিন্দুদের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির শ্রেণি-আকাক্সক্ষাও এতে যুক্ত ছিল। শ্রেণিস্বার্থে পরস্পর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দেশভাগের পথ মসৃণ করে তুলেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ হিন্দু-মুসলিম কার্যত দুপক্ষের উসকে দেওয়া তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছিল।

বিকাশমান বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থ-বিত্তে, সম্পদে, জ্ঞানে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায় থেকে ছিল পশ্চাৎপদ। তাদের যোগ্যতায় কুলাবে না অগ্রসর হিন্দুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নতির শিখরে ওঠা। দেশভাগে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অবস্থার সুযোগে নিজেদের আখের গোছানো সহজ হবে। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় সামান্য সংখ্যালঘু হওয়ার ভয়ে ভীত হয়েই দেশভাগে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকবে বলেই মান্য করে। অথচ দেশভাগে পূর্ববাংলার হিন্দু কিংবা পশ্চিম বাংলার মুসলমানের কী পরিণতি ঘটবে; এটি কারও চিন্তায় আসেনি। ক্ষমতাপ্রাপ্তির মোহে বুঝতে চায়নি রাজনৈতিক নেতারাও। তাদের কাছে ক্ষমতাপ্রাপ্তিই হয়ে উঠেছিল প্রধান লক্ষ্য। চূড়ান্তে রক্তাক্ত দেশভাগ সম্পন্ন হয়েছে উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনের মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে। দুই হাজার মাইল দূরত্বের পৃথক দুই ভূখ- পাকিস্তান রাষ্ট্রে যুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলাকে হতে হয় দিল্লির অধীন। যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।

পাকিস্তান রাষ্ট্রে যুক্ত হওয়া পূর্ববাংলার মানুষের মোহভঙ্গ ঘটতে কিন্তু বিলম্ব হয়নি। মুসলিম লীগের পতাকাতলে শামিল হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া নেতাদের বৃহৎ অংশ শাসক মুসলিম সরকারের অগণতান্ত্রিক, পূর্ববাংলা ও বাঙালিবিদ্বেষী আচরণ এবং বৈষম্যপূর্ণ কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে; পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ১৯৪৯ সালে গঠন করে প্রদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তখনকার বাস্তবতার কারণে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত করলেও পরে সেটা পরিহার করে নামকরণ হয় আওয়ামী লীগ। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মানুষের ভাষাও উর্দু ছিল না। অথচ ভারত প্রত্যাগত উর্দুভাষী পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এবং সাংস্কৃতিকভাবে পাকিস্তানের সব ভাষাভাষীকে একাট্টা করতে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়। পূর্ববাংলার বাঙালিদের

মাতৃভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষাকে স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়। উর্দু ভাষাকে চাপানোর পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে। প্রদেশের ক্ষমতা লাভ করে যুক্তফ্রন্ট সরকার। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বহিষ্কার করে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসক। পর্যায়ক্রমে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন কায়েম হয়।

আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা-আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুনির্দিষ্টভাবে স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিমুখে নিয়ে যায়। কিন্তু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ অপারেশন সার্চলাইট নামক গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। নিরস্ত্র বাঙালি নিধন অভিযানের মুখে দৃঢ় প্রত্যয়ে মুজিবনগর সরকার গঠন করে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনী পাকিস্তানিদের পরাস্ত করে এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

এই দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল বাম প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রীরাও। তাদের মিলিত সংগ্রামে, ত্যাগে-আত্মদানে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কাছে পরাস্ত ও পরাজিত হয় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের তিন প্রধান ভিত্তি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বাধীনতার পর বাহাত্তরে সংবিধান প্রণয়নকালে এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় জাতীয়তাবাদ। আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্তে শাসনতন্ত্রের চার স্তম্ভের দিকে যদি ফিরে তাকাই তাহলে আমরা কী দেখতে পাই!

সমাজতন্ত্রকে সাংবিধানিক উপায়ে বিদায় করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিদায় করেছে। আর জাতীয়তাবাদ এখন ভাষা ছেড়ে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের অভিমুখে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও, তার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে অধিক শক্তিমত্তায়। ভোটের রাজনীতিতে আমাদের শাসক দলগুলো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ামক বলেই গণ্য করে। তাদের সঙ্গে আপস করে, ক্ষমতার অংশীদার করে। তাদের পক্ষে রাখতে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা বিনাশে পর্যন্ত দ্বিধা-সংকোচ করে না।

আর গণতন্ত্র! গণতন্ত্র মানেই ভোটতন্ত্র। এ ছাড়া গণতন্ত্র নামে থাকলেও তার নিশানার দেখা আমাদের হয় না। আমাদের সামরিক-বেসামরিক সব শাসকের শাসনামলে গণতন্ত্রের তথৈবচ অবস্থা। অর্থাৎ গণতন্ত্র হরণের ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান। আমাদের সব শাসক নিজেদের জাতীয়তাবাদী পরিচয় দিয়ে এসেছেন। এই জাতীয়তাবাদী শাসনামলে গণতন্ত্র কখনো নিরাপদে ছিল না, বিকশিতও হতে পারেনি। স্বাধীন দেশে সব সরকারের আমলেই কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ দেশবাসী কখনো পায়নি।

অধিক ত্যাগ ও আত্মদানে আমাদের স্বাধীনতা এসেছে। আমাদের জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতাপ্রাপ্তিকেই প্রধান অর্জন বিবেচনা করে শাসকের আসনে বসেছে। কিন্তু সব মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার, সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠার বিপরীতে জনগণকে অধীনস্থ প্রজা হিসেবেই গণ্য করে এসেছে। তাই স্বাধীন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীনতাবঞ্চিত, অধিকারহারা। স্বাধীন দেশের শাসক-চরিত্র বিজাতীয় শাসকদেরই নির্ভেজাল ধারাবাহিক। রাষ্ট্রও তার সাবেকি চেহারা-চরিত্র নিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে। দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের মালিক দেশের জনগণ। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই রাষ্ট্র জনবিরোধী এবং ভয়াবহ মাত্রায় নিপীড়ক। রাষ্ট্রের চরম প্রতিপক্ষ জনগণ। আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীন দেশেও রাষ্ট্রের বদল ঘটল না। সমাজ তো রাষ্ট্রের অধীন। তাই সমাজও বদলাল না।

স্বাধীনতার অর্জন নিশ্চয়ই আছে অনেক। কিন্তু সবার ন্যায্য সমান না হলে হতাশা-ক্ষোভ কি জাগবে না! জাগবে এবং জাগরণও ঘটবে। এই ভূখ-ের মানুষরাই তো সর্বোচ্চ ত্যাগে ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করেছে। স্বদেশি কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ চিরকাল নিশ্চয়ই দেশবাসী হজম করবে না।

ধর্মভিত্তিক এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দুটির কোনোটিই সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা এবং মুক্তি দিতে পারেনি, পারবেও না। বিকল্প পথ নিশ্চয়ই রয়েছে। মুজিবনগর সরকার প্রবর্তিত শাসনতন্ত্রের তিন প্রধান ভিত্তি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সব মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার এবং সুযোগের সমতা বাস্তবায়িত হলেই সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি নিশ্চিত হবে বলেই মান্য করছি।

লেখক নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত