২৮ মার্চ দুপুর। সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের প্রবেশপথে রাখা দুটি নতুন মোটরসাইকেল। গায়ে লেখা প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কার। স্টেডিয়ামের বাইরে টিকিট কাউন্টারের সামনে অনবরত মাইকে গতকাল হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ-মঙ্গোলিয়া ম্যাচের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে সেই দুটি মোটরবাইকসহ অনেক অনেক আকর্ষণীয় পুরস্কারের টোপ। টিকিট নিলেই মিলতে পারে পুরস্কার। শহরজুড়ে রংচংয়ে ব্যানার-ফেস্টুন। তারপরও টিকিট কাউন্টারের সামনে নেই টিকিটপ্রার্থীদের সারি। অথচ এই ভেন্যুতেই ২০১৪ সালে হয়েছিল ফুটবলের জাগরণ! বাংলাদেশ ও নেপাল অনূর্ধ্ব-২৩ দলের প্রীতি ম্যাচে নেমেছিল দর্শকের ঢল। কাঁটাতারের বেষ্টনী পেরিয়ে হাজারো দর্শক নেমে এসেছিল মাঠে। তাদের উপস্থিতিতেই হয়েছিল খেলা। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ঠিক যেন সত্তর-আশি দশকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। এরপর এই ভেন্যুতে হয়েছে দুটি বঙ্গবন্ধু কাপের ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দুই মৌসুম ধরে নিয়মিত হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগের খেলা। একটা সময় বড় তারকা, বড় দলের খেলা নিজ আঙিনায় দেখতে না পারার আক্ষেপ এখন দূর হয়েছে। তবে ফুটবল নিয়ে সামগ্রিক আগ্রহটাই মিলিয়ে গেছে।
কেবল সিলেট নয়, ফুটবল নিয়ে অতীতের সেই উন্মাদনা দেশের কোনো প্রান্তেই আর দেখা যায় না। ফুটবলকে দীর্ঘ সময় ঢাকায় (পড়–ন চার দেয়ালে) বন্দি রেখেই সর্বনাশটা হয়েছে। এখন ঢাকার বাইরে শীর্ষ লিগেও ফেরানো যাচ্ছে না দর্শক। ফুটবলে অনাগ্রহের কারণ খুঁজতে কথা হলো সিলেটের দুজন বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠকের সঙ্গে। তৃণমূলের এই মানুষদের কথা থেকেই বেরিয়ে এলো আরও অনেক কারণ। প্রায় ৪০ বছর সিলেট জেলা দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন মাসুক মিয়া। বয়স এখন ৬৩। তারপরও ফুটবলের টানে দিনে নিয়মিত করে তার মাঠে আসা চাই, ‘আসলে আধুনিক প্রযুক্তির জোরে এখন মানুষ ইউরোপিয়ান ফুটবলে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তাই তারা আর দেশের ফুটবল দেখতে চায় না। তাছাড়া একটা সময় সিলেটের লিগে সালাউদ্দিন, টিপু, এনায়েত, বাদল, আসলাম, কায়সার হামিদের মতো বড় তারকা খেলতে আসতেন। তাদের খেলা দেখতে হাজারো দর্শক আসত গ্যালারিতে। এখন ওই মানের ফুটবলারও নেই।’ আর যোগ করলেন, ‘এই সিলেট থেকে উঠে এসে অনেকেই এখন জাতীয় দলে খেলছে। দুঃখ লাগে এই লোকাল বয়দের খেলাও দেখতে আসেন না মানুষ।’
সাবেক ফুটবলার আক্কাস উদ্দিন আক্কাই। দীর্ঘদিন ধরে সিলেট দ্বিতীয় বিভাগ লিগ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ফুটবলপাগল মানুষটি। আক্কাই আরও একটু ভেতরে যেতে চাইলেন, ‘এক খেলোয়াড় এক লিগ যতটা ক্ষতি করেছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ডিএফএ গঠনে। এর ফলে ফুটবলটা আর জেলা ক্রীড়া সংস্থার হাতে নেই। তাদের হাতে থাকলে স্পন্সরের সমস্যা হতো না। লিগগুলো হতো নিয়মিত। আমাদের এখানেই সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগ হয়েছে ২০১৬ সালে। তাছাড়া কাদের খেলা দেখতে মানুষ মাঠমুখো হবে বলেন? এখন লাখ লাখ টাকা পাচ্ছে ছেলেরা, কিন্তু পায়ে কোনো কারুকাজ নেই। মানহীন ফুটবল দেখতে চায় না কেউ। একজন তারকা নেই বাংলাদেশের ফুটবলে। জেলাগুলোতে নিয়মিত খেলা হয় না বলেই প্রতিভার বড্ড সংকট। আর ক্রিকেটের জনপ্রিয়তায় ফুটবলে আগ্রহহীনতা তো আছেই। এসব নিয়ে কেউ ভাবে না। সবাই আছে চেয়ারের চিন্তা আর পকেট ভরার ধান্দায়। একটা সময় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখার জন্য ঢাকায় চলে যেতাম। সিলেটেও মানুষ স্থানীয় লিগ দেখত টিকিট কেটে। আর এখন আবাহনী, মোহামেডান খেলা বিনে পয়সায়ও কেউ দেখতে আসে না।’
আগ্রহ নেই ঠিক। তবে ভালোবাসাটা কমেনি এখনো। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া জাহেদ খানের টিকিট কিনতে চলে আসা, ‘আমি কেন জানি ফুটবলকে অনেক ভালোবাসি। এই মাঠে যতগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছে, দেখেছি। সামগ্রিকভাবে আগ্রহটা কমেছে ঠিক। এটা দীর্ঘদিন সাফল্য না পাওয়ার কারণে। দল নিয়মিত সাফল্য পেতে শুরু করলে দেখবেন বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তেই খেলা হোক, ফুটবলপ্রেমীতে ভরে যাবে গ্যালারি।’
সাফল্য খরা ফুটবলের জন্যপ্রিয়তাটা হ্রাসের অন্যতম কারণ। সেটা ২১ বছরের জাহেদ বুঝেছেন। তবে যাদের বোঝা বড্ড জরুরি, তারা জেগে জেগেই ঘুমাচ্ছেন। তাদের ঘুমটা ভাঙবে ঠিক আরেকটি নির্বাচনের আগে।