ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় প্রধান মো. নজরুল ইসলামকে তার কক্ষে তালা দিয়ে অবরুদ্ধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। খাতা পুনরায় মূল্যায়নের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামকে দুই ঘণ্টা আটকে রাখেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অনুরোধে তারা তালা খুলে দেন। দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আজ বুধবার সকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার কথা রয়েছে উপাচার্যের।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার নম্বর মূল পরীক্ষা শুরুর আগে প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও একক সিদ্ধান্তে বিভাগটির প্রধান নজরুল ইসলাম তা করেন না। তিনি পরীক্ষার খাতা হারিয়ে ফেলায় তিনবার একটি ইনকোর্স পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এমনকি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করা কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হতে দেবেন না বলে হুমকি দেন নজরুল ইসলাম।
অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ৫১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠদান চলে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্নাতক (সম্মান) চূড়ান্ত ফলাফলে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৮৫ সিজিপিএ পেলেও স্নাতকোত্তরে সর্বোচ্চ ফলাফল সিজিপিএ ৩ দশমিক ৪৫। খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হলে অন্তত ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পয়েন্ট বাড়বে বলে শিক্ষার্থীদের দাবি।
শিক্ষকের কক্ষে তালা দিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মনির মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকে আমাদের ফার্স্ট গার্ল এমনকি পুরো বিভাগে যার রেকর্ড মার্ক তাকেও নাম্বার কমিয়ে দিয়েছেন। নজরুল স্যার আমাদের গালমন্দ করে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন আমাদের ব্যাচ থেকে শিক্ষক হতে চাইলে তিনি দেখে নেবেন। স্যারের এ কথার প্রভাবই আমাদের আজকের এ ফলাফল। আমরা নিশ্চিত খাতা পুনরায় মূল্যায়ন করলে আমাদের রেজাল্টের সিজিপিএ বাড়বে। অনেকেই চাকরির বাজারেও নামতে পারবে। উনার একক স্বেচ্ছাচারিতা থেকে আমরা মুক্তি চাই।’
স্নাতক পর্যায়ে বিভাগটিতে রেকর্ড নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী জারমিনা রহমান প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। সেই শিক্ষার্থীরও স্নাতকোত্তরের ফল সিজিপিএ ৩ দশমিক ৪৫। গত সোমবার প্রকাশিত হয় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর শ্রেণির চূড়ান্ত এ ফলাফল।
ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী জারমিনা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্যারদের কোথাও ভুল হতে পারে। আমি পুনরায় মূল্যায়ন করার অনুরোধ জানাই। আমি ভালো পরীক্ষা দিয়েছি। আমার যে ফল এসেছে তা প্রত্যাশিত নয়।’
এর আগেও বিভাগটিতে একাধিক শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা একইরকম অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিক্ষোভ ও তালা ঝুলিয়েছিল বিভাগে। বারবারই উপাচার্যের হস্তক্ষেপে সাময়িক সমাধান এলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। বারবার একাই বিভাগ প্রধানের দায়িত্ব পালন করার কারণে শিক্ষক নজরুল ইসলাম স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। গণমাধ্যম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে এর আগে সমালোচনার মুখে পড়ে আলোচিত হয়েছিলেন এই শিক্ষক।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষক নজরুল ইসলামের দপ্তরে গেলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে ধরেননি।
শিক্ষার্থীদের অবস্থানের সময় তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন প্রক্টর ড. উজ্জ্বল কুমার প্রধান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শুনেছি। এক দিনের সময় চেয়েছি আমরা। উপাচার্য স্যারকে আমরা জানাব এবং আগামীকাল (আজ বুধবার) সকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন উপাচার্য স্যার। আমাদের কথা শুনে আশ^স্ত হয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত আন্দোলনে না যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তারা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘অনুষদে সিনিয়র শিক্ষক হওয়ায় তার (ড. নজরুল ইসলামের) বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো কথা বলা যায় না। উনি ক্লাসের থেকে বেশি ব্যস্ত শিক্ষক রাজনীতিতে। ছয় মাসের কোর্স চার-পাঁচটি ক্লাস করিয়ে পরীক্ষায় বসান শিক্ষার্থীদের। যার কারণে শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষার্থী জারমিনা রহমান আমাদের প্রয়াত শিক্ষক সহকর্মীর মেয়ে। সেই শিক্ষকের সঙ্গে নজরুল স্যারের সম্পর্ক ছিল বৈরী। সেটির প্রভাবও পড়তে পারে মেয়েটির ফলাফলে। এমন ঘটনা দেখে শিক্ষক হিসেবে আমারও লজ্জা হচ্ছে।’