জানুয়ারির কথা এত সহজে ভোলার নয়। শূন্য হাতে নিউজিল্যান্ড গিয়ে কী অবিশ্বাস্য কীর্তিটাই না করেছিল বাংলাদেশ। দুই মাসের ব্যবধানে আবার তেমন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। সেবার নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে সিরিজের প্রথম ম্যাচের আগে দেশটিতে টেস্ট জয়ের অতীত ছিল না বাংলাদেশের। এবারও নেই। তবে ডারবানের কিংসমিড টেস্টের আগে বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ভিন্ন পরিস্থিতি। দেশটিতে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে টেস্টে নামছে মুমিনুল হকের দল, যা বাংলাদেশকে সাহস জোগাচ্ছে রঙিনের পর সাদা পোশাকেও ভালো করার।
এর আগে তিনবার দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছিল বাংলাদেশ। দুটি করে মোট ৬ টেস্ট খেলা হয়েছে। তার কোনোটাই ডারবানের কিংসমিডে ছিল না। ঠিক তেমনি গত নিউজিল্যান্ড সিরিজে প্রথমবার মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নামে বাংলাদেশ। প্রথম নেমেই জয় দেখেছিলেন মুমিনুলরা, এবার কিংসমিডের প্রথমেও একই ফল ফেরানোর স্বপ্ন। তাতে গত সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতকে ২-১-এ হারানোর সাফল্য দেখেও ভয় নেই বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের স্বপ্ন ঝাপসা থেকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে খোদ কিংসমিডই। ১৯২৩ সালে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে ক্রিকেটের পথচলা শুরু করা মাঠটি দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম পুরনো ভেন্যু। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে এই ভেন্যুটাই প্রোটিয়াদের জন্য অপয়া। উইন্ডিজের বিপক্ষে সে বছর ইনিংসে জয়ের পর এই ১৪ বছরে মাঠটিতে মাত্র একটি ম্যাচ জিতেছে স্বাগতিকরা। এই সময়ে ৯ টেস্ট খেলে ওই জয়ের সঙ্গে একটি ড্র যোগ করতে পেরেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তাছাড়া এই মাঠটিতে আগে থেকেই হারের সংখ্যা বেশি তাদের। ৯৯ বছরে মোট ৪৪ টেস্ট খেলে হেরেছে ১৬টিতে, ড্র ও জয় ১৪টি করে। মাউন্টে প্রথম নেমেই যখন জয় ছিনিয়ে আনা গেছে, প্রোটিয়াদের অপয়া ভেন্যুতে সেই স্বপ্নটা দেখাই যায়। টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল মেনে নিলেন তা। কিন্তু এই টেস্ট তো নতুন সেটাও মনে করিয়ে দিলেন, ‘যেমনটা বললেন হ্যাঁ, ঠিক আছে ওরা এই ভেন্যুতে ভালো খেলে না। কিন্তু এটা তো নতুন টেস্ট তাই না। আগে কী হয়েছিল সেটা তো এখানে আসবে না।’
অবশ্য পরিসংখ্যানে তাকিয়ে জয়ের চিন্তা করছেন না বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়ক। প্রতি সিরিজের মতো এই সিরিজেও সমান চোখে রেখে জিততে চাইছেন, ‘আমি তো সবসময় বলি যে জেতার জন্যই খেলি। এই সিরিজেও আমরা জেতার জন্যই খেলব। তার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রক্রিয়া মতো আগানো। পাঁচ দিন ভালোভাবে দাপট ধরে রাখলে ফল অবশ্যই আমাদের পক্ষে আসবে।’
তা ছাড়া বিদেশের মাটিতে ভালো করার অভ্যাসটাও যে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। গত বছর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ড্র, জিম্বাবুয়ে ও নিউজিল্যান্ডে পরপর সিরিজে টেস্ট জয়ের পর এবারও ধারাবাহিকতা রাখার ভরসা আসছে। এবার তো অভিজ্ঞতাতেও এগিয়ে বাংলাদেশ। আইপিএলের কারণে সেরাদের হারানো স্বাগতিকদের মিলিত টেস্ট খেলার সংখ্যা ২০৬টি। বিপরীতে মুমিনুলরা সবাই খেলেছেন ৩৬২ টেস্ট। এই ফরম্যাটে অভিজ্ঞদেরই সফলতার হার বেশি। হিসাবে তাই বাংলাদেশ এগিয়ে। কিন্তু অধিনায়ক উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছেন না। কারণ টেস্ট পাঁচ দিনের খেলা, ‘অভিজ্ঞতায় একটু হয়ত এগিয়ে থাকব। কিন্তু সুবিধা ওরাও পাবে। যেমন ওরা ঘরের মাঠে খেলছে। তো দুই দলেরই কিছু কিছু সুবিধা থাকবে। কিন্তু বড় জিনিস হলো পাঁচ দিন ১৫টা সেশন ভালো খেলা। ভালো জায়গায় বল করা, ভালো ব্যাটিং করা গুরুত্বপূর্ণ।’
ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ একাদশ নির্বাচন করা। সাকিব আল হাসান না থাকায় বাংলাদেশকে একজন বাড়তি বোলার/ব্যাটার নিয়ে খেলতে হচ্ছে। মুমিনুলরা যে ব্যাটারের দিকে ঝুঁকবেন সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ওপেনিংয়ে গত টেস্টের একাদশে একটি বদল নিশ্চিত। তামিম ইকবাল ফিরছেন, সাদমান ইসলাম দলের বাইরে। তামিমের সঙ্গে মাহমুদুল হাসান জয় ওপেন করবেন বলে জানান মুমিনুল। তিনে শান্ত, এরপর মুমিনুল, মুশফিক, লিটন, রাব্বি, মিরাজ, তাসকিন, এবাদত, শরিফুল। একাদশে তিন পেসার যে থাকবেন তা নিশ্চিত। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে মুমিনুল পেসারদের ওপরই ভরসা রাখার কথা জানান।
এদিকে স্বাগতিক হয়েও ব্যাকফুটে দক্ষিণ আফ্রিকা। অধিনায়ক ডিন এলগার তাই পড়েছেন বিপদে। বোর্ড সেরা ক্রিকেটারদের আইপিএল খেলার সিদ্ধান্ত তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। রাবাদা-মার্করামরা তাই আইপিএলে। নিরুপায় এলগার তাই খর্বশক্তির দল নিয়ে নামছেন। তার চোখে বড় স্বপ্ন তাই নেই। ভারতকে গত সিরিজে হারানোর আত্মবিশ্বাসও পাচ্ছেন না। তাই ২০১৭তে বাংলাদেশের বিপক্ষে কী করেছিলেন সব ভুলেও যেতে চান। নতুন সিরিজে বাংলাদেশকে পরিবর্তিত দল বলেই এগিয়ে রাখলেন।
কিংসমিড টেস্ট তাই দক্ষিণ আফ্রিকাতে সাদা পোশাকে নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জোর ভরসা দিচ্ছেন দলে থাকা প্রোটিয়া কোচরা। ডমিঙ্গো-ডোনাল্ডরা কিংসমিডের খুঁটিনাটি জানিয়ে দিচ্ছেন মুমিনুল-এবাদতদের। সব মিলিয়ে ওয়ানডের পর টেস্টেও তাই ইতিহাসের সুবাস বাংলাদেশ শিবিরে।