পাকিস্তানে সরকারবিরোধী জোটের চার নেতা

পাকিস্তানে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট হতে যাচ্ছে সংসদে। নিজ দলের এমপি ও জোটসঙ্গীদের সমর্থন হারিয়ে চাপে ইমরান। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো বিরোধীজোট অনেকটা নির্ভার। ইমরানবিরোধী জোটের প্রধান চার মুখ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ

অনাস্থা ভোটের অপেক্ষায়

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। তাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বিরোধীরা এককাট্টা হয়েছে। এমনকি তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং ছোট ছোট কয়েকটি দল ক্ষমতাসীনদের জোট ছেড়ে বিরোধী শিবিরের হাত ধরেছে। ইতিমধ্যে ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী রবিবার এ বিষয়ে সংসদে ভোট হবে এবং সোমবারের মধ্যে পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটি ফয়সালা হবে।

ইমরান খান ২০১৮ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসে তিনি খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ ও বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও দিন দিন বাড়তে থাকা ঘাটতির জেরে ইমরানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সমালোচনার মুখে পড়ে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করবেন। এই দুটি কাজের একটিও সফলভাবে করতে পারেননি। এরই মধ্যে চাউর হয়েছে, ইমরান খানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর বিরোধ পুরনো। তাদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।

পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারলেও আস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার নজির নেই। এর আগেও ইমরান খান আরেকবার আস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে যাত্রায় কোনো রকমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। তারও আগে শওকত আজিজ ও বেনজির ভুট্টোর বিরুদ্ধে আস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তারা দুজনই পরাজয় ঠেকিয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। এবার ইমরান কি পারবেন আস্থা ভোটের বৈতরণী উতরে তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে, সেই প্রশ্নই এখন জোরালোভাবে উঠছে।

সরকারবিরোধী আন্দোলন

পাকিস্তানের ১৩তম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তেহরিক-ই-ইনসাফ ক্ষমতায় আসে। তবে ইমরানের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাই ছোট ছোট কয়েকটি দল নিয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনে ইমরান খান পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় কারচুপির মাধ্যমে জয়লাভের অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। তখন থেকেই তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। ইমরানবিরোধী দলগুলো ‘ভোট কো ইজ্জত দো’ অর্থাৎ ‘ভোটকে সম্মান দাও’ স্লোগান সামনে রেখে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) নামে সরকারবিরোধী একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করে। জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান। জোটে ছোট-বড় ১৩ দল রয়েছে। তন্মধ্যে পাকিস্তানে একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা দুই দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) অন্যতম। জোট গঠনের পর থেকে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করছে পিডিএম। এরই অংশ হিসেবে ইমরানের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপন করেছেন পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরীফ।

ইমরানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে পিডিএমের চেয়ারম্যান মাওলানা ফজলুর রহমান, পিএমএল-এন প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরীফ, পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ একসঙ্গে সমান্তরালভাবে সংসদে এবং সংসদের বাইরে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রৃাম করে ইমরানবিরোধী মুখ হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শুরু থেকেই পাকিস্তানের ক্ষমতার লড়াইয়ে যুযুধান তিন পক্ষের একত্রে পথচলা নিয়ে নানা শঙ্কার কথা বললেও ধারণা করা হচ্ছে, পিডিএম তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি।

মাওলানা ফজলুর রহমান

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে লাখো জনতার অংশগ্রহণে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। লংমার্চ-পরবর্তী অভূতপূর্ব মহাসমাবেশ করে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেন মাওলানা ফজলুর রহমান। পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের চেয়ারম্যান মাওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত নাম। তার পিতা মুফতি মাহমুদ ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের শীর্ষ নেতা সীমান্ত প্রদেশের অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী।

১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন ডেরা ঈসমাইল খান জেলার আবদুল খয়ের গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মাওলানা ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন মাওলানা সনদ লাভ করেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে পিতা মুফতি মাহমুদের ইন্তেকালের পর তিনি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮১ সালে পাকিস্তানের সেনাশাসক জিয়াউল হকের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবন্দি হন। কারাবন্দি থাকাবস্থায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে আল্লামা আবদুল্লাহ দরখাস্তির ইন্তেকালের পর তিনি জমিয়তের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।

আশির দশক থেকে পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে মাওলানা ফজলুর রহমান সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দশবারেরও অধিক কারাবরণ করেছেন। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো ডিআইখান আসন থেকে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ন। এরপর একাধিকবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে বেনজির ভুট্টো দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এলে মাওলানা ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। ২০০২ সালে মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে পাকিস্তানের সবক’টি ইসলামি দলকে সঙ্গে নিয়ে মাওলানা ফজলুর রহমান ‘মুত্তাহিদা মজলিসে আমল’ বা এমএমএ নামে জোট গঠন করে নতুন এক শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হন। ২০০২ সালে এমএমএ ৭২টি আসন লাভ করে, তিনি জয় পান দুই আসনে। তাকে প্রধানমন্ত্রী পদের সম্ভাব্য প্রার্থী মনে করা হয়, কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তাকে নিয়োগ না দিয়ে ১৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মীর জাফরুল্লাহ খান জামালিকে নিয়োগ দেন। পরে ২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা ফজলুর রহমান।

মাওলানা ফজলুর রহমান রাজনীতির দূরদর্শী এক ব্যক্তিত্বরূপে পাকিস্তানে সুপরিচিত। জাতীয় রাজনীতির যেকোনো দুর্যোগকালে ক্ষমতাচ্যুত সকল নেতাই তার দ্বারস্থ হন। মত ও সিদ্ধান্তে অনেক সময় ত্রুটি হতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্বীকৃত এবং অনন্য। এই অনন্য গুণের কারণে তিনি পিপিপি ও মুসলিম লীগ (এন)সহ পাকিস্তান রাজনীতির নানা পক্ষকে এক সুতায় গেঁথে পিডিএমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০০৫ সালের এশিয়ান সার্ভে রিপোর্টে মাওলানাকে এশিয়ার ৫ম ও বিশ্বের ঊনিশতম ধীমান রাজনীতিবিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলমান আন্দোলনে ইমরান খান পদচ্যুত হলে শাহবাজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মাওলানা ফজলুর রহমানের। তার পরও মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে ইমরান খানের বিরোধের নিষ্পত্তির সম্ভাবনা নেই। কারণ উভয়ের ঘাঁটি এক। অর্থাৎ খাইবার পাখতুনওয়া, আগে যাকে সীমান্ত প্রদেশ বলা হতো। এখান থেকেই মাওলানা ফজলুর রহমানের বাবা মুফতি মাহমুদ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। এই অঞ্চলে মাওলানার একক আধিপত্য ছিল। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে প্রদেশের দখল চলে যায় ইমরান খানের দল পিটিআই’র কাছে। এখনো খাইবার পাখতুনওয়া ইমরান খানের দখলে। এতেই মূলত মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে ইমরান খানের বিরোধ শুরু। সর্বশেষ নির্বাচনে মাওলানা ফজলুর রহমান নিজের আসনে হেরে যান। এতে করে বিরোধটা আরও চরমে পৌঁছায়।  ২০১৮ সালে পাকিস্তান মুসলিম লীগসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে।

ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিক শাহবাজ শরীফ

ইমরানবিরোধী চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই সাংবাদিক সম্মেলন করে পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন শাহবাজ শরীফ। এর আগে মুসলিম লীগ নেত্রী মরিয়ম নওয়াজও তার নাম ঘোষণা করেছেন। শাহবাজ শরীফ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভাই। বর্তমানে তিনি পাকিস্তান মুসলিম লিগের (নওয়াজ) সভাপতি।

শাহবাজ তিন দফায় পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ওই প্রদেশে তিনিই সবচেয়ে বেশি দিন মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকেছেন। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে প্রাদেশিক নির্বাচনে শাহবাজ প্রথম জয়ী হন আর জাতীয় সংসদের সদস্য হন ১৯৯০ সালে। পাঞ্জাবের উন্নয়ন আর পাকিস্তানের রাজনীতিতে শাহবাজের বিশাল অবদান রয়েছে। সেনাশাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেছেন তিনি। ২০১৩ সালে তিনি তৃতীয়বার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০১৮ সাল অবধি তিনি ওই পদে ছিলেন। ওই বছর তিনি পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হন। গত ২৮ মার্চ তিনি সংসদে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (ন্যাব) শাহবাজ ও তার ছেলে হামজা শরীফের ২৩টি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে ন্যাব। গত বছর এপ্রিলে লাহোর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। ১৯৫১ সালে পাঞ্জাবে শাহবাজের জন্ম হয়। তার পিতা মুহাম্মদ শরীফ ছিলেন সম্পন্ন ব্যবসায়ী। ভারত ভাগের পরে তাদের পরিবার লাহোর চলে আসেন। লাহোরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার পাট চুকিয়ে তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন। ১৯৮৫ সালে তিনি লাহোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হন।

ভুট্টো পরিবারের প্রতিনিধি বিলাওয়াল

পাকিস্তানের রাজনীতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো একটি আলোচিত নাম। এই ভুট্টো পরিবারের তিন প্রজন্মের রাজনীতি দেখার সুযোগ পেয়েছে দেশটির মানুষ। দেশটির উত্থান-পতনের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবারের দল বলে পরিচিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় ছিল। বর্তমানে ভুট্টো পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম বিলাওয়াল পিপিপির চেয়ারম্যান। পাকিস্তানের এলিট পরিমণ্ডলে নামের শেষে বাবার বংশপদবি ধারণের রেওয়াজ থাকলেও বোধগম্য রাজনৈতিক প্রয়োজনেই অক্সফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী ‘বিলাওয়াল জারদারি’ মায়ের বংশলতিকাও যুক্ত করেছেন নামের একাংশ হিসেবে। এখন তিনি ‘বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি’ পরিচয় ব্যবহার করেন।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১৯৭৯ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। পরে তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো দলের হাল ধরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন বেনজির। এরপর দলের কর্র্তৃত্ব নেন তার স্বামী বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আসিফ আলী জারদারি। নিজে নেন দলের কো-চেয়ারম্যানের পদ। চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টোর নাম। ব্যাপক দুর্নীতির জন্য পাকিস্তানে জারদারির ‘মিস্টার টেন পারসেন্ট’ বলে কুখ্যাতি রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জোট সরকার গঠন করে পিপিপি। জারদারি নির্বাচিত হন দেশের প্রেসিডেন্ট। ২০০৮-২০১৩ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তরুণ বিলাওয়ালকে সামনে রেখে বৈতরণী পার হতে চেয়েছিল পিপিপি। কিন্তু দলের ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি। দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভুট্টো পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম বিলাওয়ালকে কাজে লাগানোর নানা চেষ্টাই করছে পিপিপি। সেই চেষ্টার অন্যতম হলো পিডিএমে শরিক হওয়া। তবে বিলাওয়াল এখনো সেভাবে আলোচনায় আসতে পারেননি। এখনো রয়ে গেছেন বাবা জারদারির ছায়ায়। বয়স কম ও অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও দলের পুনরুজ্জীবনে বিলাওয়ালকে আশার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কারণ তাকে তার বাবা জারদারির তুলনায় ভালো বিকল্প মনে করেন পিপিপির নেতাকর্মীরা। ইমরান আস্থা ভোটে হেরে গেলে নতুন সরকারে পিপিপি কিংবা বিলাওয়ালের ভূমিকা কী হবে, সেটার ওপর নির্ভর করছে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

প্রভাবশালী নারী নওয়াজকন্যা মরিয়ম

১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহণকারী মরিয়ম নওয়াজ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মেয়ে। ৪৯ বছর বয়সী মরিয়ম পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম মুখ। ভয়ডরহীন কণ্ঠে দেওয়া তার ভাষণে দর্শকরা যেমন আন্দোলিত হন, তেমনি তাতে থাকে রাজনীতির নানা রসদ। নওয়াজ কন্যা ইতিমধ্যে বিশ্বময় পরিচিতি অর্জন করেছেন নিজের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে। ইমরান খানের কড়া সমালোচক হিসেবে তিনি পরিচিত। দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিউক্লিয়াসের ভূমিকা রাখছেন এই নারী।

২০১২ সালে মরিয়ম তার বাবার দল পাকিস্তান মুসলিম লীগে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি দলটির সহসভাপতি। ১৯৯২ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মরিয়মের বিয়ে হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সফদর আওয়ানের সঙ্গে। মরিয়ম পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনিয়মিত ছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা করে ২০১২ সালে ডিগ্রি নেন। দুই কন্যা এবং এক ছেলের জননী মরিয়ম তার বাবা নওয়াজ শরীফ ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে নির্বাসনে যাওয়ার প্রেক্ষিতে রাজনীতিতে আগ্রহী হন। মুসলিম লীগ কর্মীরা মনে করেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে দুই ভাই ও চাচাকে ছাপিয়ে ভবিষ্যতে নওয়াজ শরীফের উত্তরাধিকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন মরিয়ম।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের কন্যা মরিয়ম নওয়াজ ২০১৭ সালের সেরা ১১ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পান। তালিকাটি প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। মোট ১১ জনের তালিকায় সর্বশেষ নাম ছিল ৪৪ বছর বয়সী মরিয়মের। ২০১৬ সালে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির সঙ্গে মরিয়মের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হয়। তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, বাবা নওয়াজ শরিফের অপ্রদর্শিত সম্পদের মালিকানায় আছেন মরিয়ম। ২০১৮ মালে বাবা নওয়াজ শরিফের সঙ্গে মরিয়ম নওয়াজকেও দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলে মরিয়ম আইন অনুযায়ী অন্য কারাবন্দিদের শিক্ষা দিয়ে সশ্রম দণ্ড খাটেন।