শিক্ষক বাবার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মাইশা মমতাজ মীম। পড়তেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে। ছোট মেয়ে রূপসী মমতাজ মৌ। এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে গতকাল শুক্রবারই বাবার হাত ধরে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার হলে ঢুকেছিলেন। ছোট মেয়েকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে বাইরে আসার কিছুক্ষণ পরই সড়ক দুর্ঘটনায় বড় মেয়ে মীমের মৃত্যুর খবর পান শিক্ষক বাবা নূর মোহাম্মদ মামুন। মুহূর্তেই দুই মেয়েকে নিয়ে গড়া তার স্বপ্নের পৃথিবীতে ভর করেছে বিষাদের কালো ছায়া। মেয়ের মৃত্যুর খবরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী এই শিক্ষক বাবা চেতনা ফিরে পেয়েই বড় মেয়ের জন্য বিলাপ করছিলেন। দুই মেয়েকে নিয়ে স্বপ্নের পৃথিবী গড়তে চাইলেও সড়কের দানব মূহূর্তই সব ওলটপালট করে দিয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর খিলক্ষেতে ফ্লাইওভারের ওপরে বেপরোয়া গতির একটি কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে ছিল মীমের। তার মামা এ কে এম হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বোনের মধ্যে মীম ছিল বড়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না মীমের। গতকালই ওর ছোট বোন মৌয়ের ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসেই মৌ জানতে পারে তার বড় বোন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। ওদের মাকে জানানো হয়েছে আরও অনেক পরে। মেয়েকে হারিয়ে বাবা-মা দুজনেই এখন শয্যাশায়ী।’
দুর্ঘটনায় নিহত মীমের মামা অ্যাডভোকেট এ কে এম হাবিবুর রহমান চুন্নু বলেন, ‘আমার ভাগনি এমন অসময়ে চলে যাবে ভাবতে পারিনি। গত বুধবারও ওর সঙ্গে কথা হয়েছে। মেয়েটা খুব মিশুক ছিল।’
পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় চাকরিকে বিদায় জানান মীম : ডিজিটাল ক্রিয়েটিভ এজেন্সিতে সহকারী প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন মাইশা মমতাজ মীম। তাকে নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রিন্স চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমি লাইফে কোনো টিম মেম্বারকে নিয়ে লিখি নাই আর লিখতাম নাকি তাও জানি না তবে গতকাল (বৃহস্পতিবার) মীমের আমার অফিসে জব করার শেষ দিন ছিল। তাই আজকে ওকে নিয়ে একটা সেলফি তুলতাম আর পোস্ট দিতাম যে ও আমার অফিস টিম মেম্বার হিসেবে এবং বিজনেসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল। যদি সে অন্য কোথায় জব করত তাহলে ওকে বেস্ট অ্যান্ড বেস্ট টিম মেম্বার অ্যাওয়ার্ড দিত। আমি পোস্টটা এখনো লিখছি কিন্তু হাত কাঁপছে আর এই অবস্থায় লিখতে হবে কখনো ভাবি নাই, ওর কথা কীভাবে বলব সেইটা বুঝতেছি না।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘২০২১ সালের জুন মাস থেকে সে সহকারী প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা শুরু করে। অফিসের সবকিছুর টিম রেডি আছে কিন্তু আমার ক্লায়েন্ট হ্যান্ডলিং করার মতো বিশ্বস্ত, সৎ এবং মনোযোগী একজন সহকারী খুঁজছিলাম প্রায় এক বছর কারণ এইটা খুবই কনফিডেনসিয়াল একটি কাজ আমার কোম্পানির জন্য। মীম আমার জীবনে দেখা সবথেকে অনেস্ট এবং ভদ্র একটি মেয়ে ছিল। ওর কিছু গুণ আছে যা আরও ১০টা মেয়ের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে না, ওর চিন্তাভাবনা আমার সাথে শেয়ার করত যা আমরা অনেক টাকা আয় করার পরেও মানুষকে নিয়ে এইভাবে চিন্তা করি না। আর আমার কোম্পানিতে ওর শুধুমাত্র কাজ ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্ট হ্যান্ডলিং করা আর টিমের কাছ থেকে কাজের আপডেট করা। কিন্তু মীম এতটাই ডেডিকেটেড একটা মানুষ ছিল যে আমার ক্লায়েন্টের সাথে স্ক্রিপ্টেড মিটিং যদি সন্ধ্যায় থাকত তাহলে সে সারা দিন সেইটা নিয়ে ভাবত, আর এই ভাবনার কারণে তার ভার্সিটি গ্রেড কম হয়ে যায়। এতটা সিম্পল কাজেও মীম এতটা ডেডিকেটেড ছিল যে সাহসে আমি আরেকটা বিজনেস দাঁড় করিয়ে ফেলেছি, ওর ডেডিকেশন লেভেল এতটাই ছিল যে আমি এখন পুরোপুরি অলস। ও থাকা অবস্থায় আমাকে গত ৬ মাসে কোনো ক্লায়েন্ট নিয়ে ভাবতে হয় নাই এবং কোন ক্লায়েন্টের প্রোজেক্ট কোন টিম মেম্বার কখন করবে সেইটার টোটাল ব্যাপারটাই মীম ম্যানেজ করত। আমার কমিউনিটির সিনিয়ররা বললে আমি এখন কোনো কিছু না করেই কীভাবে চলি? যা বলব পুরোটাই মীম দেখত। এক কথায় আমাকে কোনো টেনশন করতে হতো না আমার কোনো কাজের জন্য। যেহেতু কাজ করার কারণে গত সেমিস্টার ওর রেজাল্টে ইমপ্যাক্ট পড়ছিল তাই জানুয়ারি মাসে লিভ নিতে চায় এন্ড আমি ওকে প্রসেসিং অনুযায়ী মার্চ মাসে ছাড়তে বলি। ওর লাস্ট মাসের স্যালারি দেওয়া হয়নি তাই অফিসে আসবে কখন গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতেই কথা হচ্ছিল কিন্তু আজকে (গতকাল) যে এই সংবাদ শুনব তা কল্পনাও করি নাই।’
গত সপ্তাহে মীমের মতো সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েও একটুর জন্য বেঁচে যান স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহীদা খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় স্কুটি নিয়ে যাওয়ার সময় সাভার পরিবহন ও ঠিকানা পরিবহনের দুটি গাড়ি সড়কে বেপরোয়া গতিতে পাল্লাপাল্লি করে যাওয়ার সময় আমার স্কুটির ওপরে উঠে গিয়েছিল। আমি বাসগুলো থেকে বাঁচার জন্য সাইডে চলে গেলে পিছন থেকে আসা আরেকটি কাভার্ড ভ্যান আমাকে ধাক্কা মারে। এতে গুরুতর আহত হয়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহরে এখন যে জ্যাম তার জন্যই মূলত স্কুটি নিয়ে ছুটে চলতে হয়। কিন্তু সড়কে থাকা অন্য গাড়িগুলো মেয়েদের দেখলে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লেগে যায়। সেদিন আমি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলেও মীম কিন্তু বাঁচতে পারেনি ঘাতক কাভার্ড ভ্যান থেকে। ওই ঘাতক চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’