দেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মধ্যে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও রয়েছে। এসব প্রকল্পে করা বিনিয়োগ দ্রুত সময়ে ফেরত না এলে বাংলাদেশকেও শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করতে হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।
গতকাল শনিবার ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
আইসিএবির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেনের সভাপতিত্বে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে ‘সামষ্টিক অর্থনীতি : ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যশা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের অনেকগুলো মেগা প্রকল্প হচ্ছে, যেগুলোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু এমন অনেকগুলো আছে, যেগুলোর এই মুহূর্তে আসলে কোনো উপযোগিতা বা প্রয়োজন নেই। পদ্মা সেতু আমাদের দরকার আছে, যদিও এখানে ব্যয় বেড়েছে অনেক। কিন্তু ওই রুটে পদ্মা রেল সেতুর খুব একটা প্রয়োজন নেই। কারণ পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে ওই এলাকা থেকে সহজেই পণ্য ঢাকায় আসবে, আবার নৌপথ রয়েছে। এখানে রেলপথে যে এক্সট্রা ভ্যালু এডিশন হওয়ার কথা, সে সুযোগ নেই। যে বিশাল বিনিয়োগ হচ্ছে, সেটা ফেরত আসার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন হচ্ছে, তা দরকার আছে। এই পথে আরও বিনিয়োগ দরকার। কারণ, এটা আমাদের অর্থনীতির লাইফ লাইন। কিন্তু আমাদের বিশাল টাকা খরচ করে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন বসানোর কোনো দরকার নেই। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের এমন কোনো বাণিজ্য হবে না, যা দিয়ে এই বিনিয়োগ ফেরত আসতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে আমাদের ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমরা আড়াই বিলিয়ন ডলারের জায়গায় ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছি। এই প্রকল্প হয়তো আমাদের দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসবে। কিন্তু আমাদের টাকা তো এখন দরকার। এ টাকা দিয়ে যদি আমরা আমাদের সবগুলো হাইওয়ে ফোর লেন করে ফেলতাম, সড়কগুলো আরও চওড়া করতে পারতাম, তাহলে রেট অব রিটার্ন অনেকগুণ বেশি পেতাম। অর্থনীতিতে আরও দ্রুত উপকার পাওয়া যেত।’
আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, ‘আমাদের এখন যে পরিমাণ রপ্তানি হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আমদানি হচ্ছে, আবার রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়ছে। এখন যেভাবে চলছে, সেই হিসাব অব্যাহত থাকলে বছর শেষে ঘাটতি ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার হবে। কিন্তু ইতিহাসে কখনই আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি ৮ থেকে ৯ বিলিয়নের বেশি হয়নি। এই আয় ও ব্যয়ের হিসাবে এখনই সচেতন হতে হবে।’
মনসুর বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকের ডিপোজিট কমছে, এতে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যাবে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মুনাফা কমছে। এক সময় ব্যাংক খাতের রিটার্ন অব অ্যাসেট ছিল ১ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। রিটার্ন অব ইক্যুইটি যেখানে ছিল ২৪ শতাংশ, তা এখন নেমে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশ। তাহলে দেশে এত ব্যাংক কেন হচ্ছে? কেন নতুন নতুন ব্যাংকের জন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে? কারণ এখন যারা ব্যাংক চাচ্ছে, তারা ব্যক্তিস্বার্থে চাচ্ছে, ব্যাংক খাতের স্বার্থ বা অর্থনীতির স্বার্থে চাচ্ছে না। এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, বাজেট বরাদ্দে প্রয়োজনীয়তার চেয়ে রাজনীতি গুরুত্ব পায় বেশি। এই বরাদ্দ দিতে গিয়ে সরকার একধরনের ‘ঠেকা’র মধ্যে পড়ে। কায়েমি স্বার্থ বরাদ্দ বিভাজনকে প্রভাবিত করে। বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা গণতান্ত্রিক সমাজে থাকা উচিত নয়। হঠাৎ করে এই বেড়াজাল ভাঙা সহজ নয়। তবে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা চেষ্টা করছেন। আশা করা যায় তিনি সফল হবেন।
পুরো আলোচনায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও হিসাববিদরা রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, করপোরেট কর কমিয়ে আনা, করোনা প্রভাব মোকাবিলা এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া নতুন বৈশি^ক পরিস্থিতিতে করণীয়, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি, এসএমই খাতের বিকাশ, সরকারি ব্যয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন আইসিএবির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন। তিনি বলেন, দেশ এগোচ্ছে। তবে বৈষম্যও বাড়ছে। এর কারণ হচ্ছে পরোক্ষ কর। তিনি প্রত্যক্ষ কর ও অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিবর্তে বৈদেশিক ঋণসহায়তা ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় রাজস্বব্যবস্থা, করের অর্থের সঠিক ব্যবহার, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোসহ সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বাজেট থেকে যে বিনিয়োগ হয়, সেখানে সংস্কার দরকার। শিক্ষা খাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ বাজেট দিতে হবে। তিনি বলেন, জাতির জনক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। তখন জিডিপি ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কেন জাতীয়করণ হবে না।
এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে গত দুই বছর পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক কাজ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। কারণ এই পরিকল্পনা যখন করা হয়েছিল তখন করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল না। তিনি করপোরেট কর কমানো ও সব রপ্তানি খাতে সমান সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, অগ্রিম আয়কর নেওয়া বন্ধ করতে হবে। অগ্রিম আয়কর বাবদ যে টাকা সরকারের কাছে যেত, সেই টাকা কোম্পানিগুলো যাতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি উৎসে কর নেওয়া বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো দেশ এই কর নেয় না। তিনি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, কয়লা উত্তোলন বাড়ানো ও পিপিপিতে ভালো প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, শিল্প খাতের অর্থায়নের অতিমাত্রায় ব্যাংকনির্ভরতা দূর করতে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারকে উন্নত করতে হবে।
এ ছাড়া আইসিএবির সিইও শুভাশীষ বসু, ইআরএফ সভাপতি শারমীন রিনভী ও সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।