টিপু হত্যার পরিকল্পনাকারী ওমর ফারুক, সমন্বয়ে মুসা

পুরনো দুটি হত্যা মামলাসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড হয় ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে। পুরো ‘কিলিং মিশনের’ সমন্বয়কারী ছিলেন সুমন শিকদার ওরফে কিলার মুসা। অবশ্য তিনি টিপুকে হত্যার আগেই গোপনে দুবাই চলে যান। সেখানে বসেই তিনি হত্যাকাণ্ডের ছক কষেন। আর হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক। টিপু ও কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে এসব কথা জানিয়েছে র‌্যাব।

গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার সকালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর মুগদা, শাহজাহানপুর ও মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই চারজনকে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেনআওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার ওরফে শ্যুটার সালেহ (৩৮), নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির (৩৮) ও মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশ (৫১)।

এদিকে টিপু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর গতকাল ওমর ফারুককে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

টিপু হত্যার বিষয়ে জানাতে গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংস্থাটির মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন বলেন, পুরনো দুটি হত্যা মামলা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই টিপু হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আবু সালেহ শিকদার ওরফে শ্যুটার সালেহও এ ঘটনার পরিকল্পনা ও অর্থ প্রদানের  সঙ্গে জড়িত। তিনি রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবু হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত দুই নম্বর আসামি। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধে ১২টি মামলা রয়েছে এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেছেন।

গ্রেপ্তার চারজনই সাবেক যুবলীগ নেতা মিল্কীর অনুসারী ছিলেন জানিয়ে এ র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালে যুবলীগ নেতা মিল্কীকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া চারজনই একসময় মিল্কীর অনুসারী ছিলেন। তারা বিশ্বাস করেন, মিল্কী হত্যাকাণ্ডে জাহিদুল ইসলাম টিপু জড়িত। মিল্কী হত্যার পর বিচার দাবিতে এলাকায় টিপুর বিরুদ্ধে পোস্টারিং, মিছিল, মানববন্ধন ও আলোচনা সভা করেছিল গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা। পরে আদালতে টিপু অব্যাহতি পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

টিপু হত্যার আরেকটি উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এই হত্যার পরিকল্পনাকারীরাই ২০১৬ সালে রিজভী হাসান ওরফে বোঁচা বাবুকে হত্যা করে। বাবু ছিলেন টিপুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বাবু হত্যা মামলায় পুলিশ এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনকে (ওমর ফারুক, আবু সালেহ শিকদার ও নাসির উদ্দিনের) অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে। সেই মামলাটি বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে রায়ের অপেক্ষায় আছে। এই মামলায় অভিযোগপত্রে থাকা আসামিরা মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশকে সুরতহাল সাক্ষী বানায় মামলার গতিপথ পাল্টানোর জন্য।

কমান্ডার মঈন আরও বলেন, বাবু হত্যার ঘটনায় মামলা করেছিল তার বাবা আবুল কালাম। কিন্তু মামলা পরিচালনার যাবতীয় খরচসহ সবকিছু দেখভাল করছিলেন নিহত টিপু। আসামিরা ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলাটি থেকে নিষ্কৃতির জন্য টিপুকে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু টিপু রাজি হননি। গ্রেপ্তার চারজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব কর্মকর্তাদের বলেন, টিপুর কারণেই মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে গেছে এবং বিচার দ্রুত হচ্ছে। এ মামলায় তাদের কারও ফাঁসি হবে বলে আসামিদের আশঙ্কা ছিল। তাই মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে প্রথমে মামলার বাদীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু টিপুকে হত্যা করলেই মামলার কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে বলে পরবর্তী সময়ে আসামিরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেন।

র‌্যাব জানিয়েছে, মূলত বোঁচা বাবু হত্যা মামলার রায় দীর্ঘায়িত করতেই টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে কিলার মুসা। মুসা তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রকাশ-বিকাশের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া মতিঝিল এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, স্কুল-কলেজের ভর্তি বাণিজ্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে টিপু এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।

যেভাবে পরিকল্পনা ও হত্যা: র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন থেকে চার মাস আগে টিপু হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ওমর ফারুক। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মুসার সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করেন। এই টাকার বেশিরভাগেরই জোগান দেন তিনি। প্রথমে মুসাকে ৯ লাখ টাকা দেন ওমর ফারুক।

২০১৬ সালে বোঁচা বাবু হত্যার প্রসঙ্গ টেনে র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, ‘স্বার্থের বিভিন্ন দ্বন্দ্বের কারণে কিলার মুসার মাধ্যমেই আন্ডারগ্রাউন্ডের সন্ত্রাসীদের সহায়তায় বোঁচা বাবুকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন টিপুর সবচেয়ে কাছের মানুষ। সে কারণেই নিহত বাবুর বাবা এবং মামলার সাক্ষী কালামকে সহায়তা করে আসছিলেন টিপু। মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ। মামলার আসামিদের মনে ভয় ছিল মামলাটি যদি দ্রুতগতিতে চলে, তাহলে তাদের ফাঁসির রায় হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই তারা টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। কিলার মুসা নিজেও বোঁচা বাবু হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত তিন নম্বর আসামি। সেই মামলার হাজিরা থেকে বাঁচতে আদালতে করোনার সনদ উপস্থাপন করেন তিনি।’

নিহত টিপু একসময় মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে ঢাকা উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিল্কী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর দলে পদ হারান। পরে অবশ্য ওই মামলা থেকে টিপু অব্যাহতি পান বলে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন। তিনি দলীয় পদ আর ফিরে না পেলেও তার স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি এলাকার নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর। যে ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ফারুক গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেই ১০ নম্বর ওয়ার্ডে টিপুর হোটেল রয়েছে, যেখানে তিনি নিয়মিত বসতেন। এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি করতেন টিপু। পাশাপাশি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন।

দায়িত্ব দেওয়া হয় মুসাকে: কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন জানান, নাসিরের সঙ্গে আলাপ করে টিপুকে হত্যার জন্য কিলার মুসাকে দায়িত্ব দেন ওমর ফারুক । এ ছাড়া কাইল্লা পলাশের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীও টিপুকে হত্যার বিষয়টি জানায়। পরে তারা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ১৫ লাখ টাকার বাজেট দেয়। যেখানে কিলিং মিশনের দায়িত্ব পড়ে মুসার ওপর। সমন্বয়কারী হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শ্যুটার ঠিক করে মুসা।

দুবাইতে বসে হত্যার ছক: র‌্যাব জানায়, টিপু হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন আগে গত ১২ মার্চ গোপনে দুবাই চলে যান কিলার মুসা। সেখানে বসেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে শ্যুটার নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। দেশ থেকে কিলার নাছির ও কাইল্লা পলাশসহ কয়েকজন হত্যার আগে টিপুর অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করে। ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর কিলার নাছির আনুমানিক চারবার টিপুর অবস্থান সম্পর্কে মুসাকে অবহিত করেন। পরে টিপু গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় কাইল্লা পলাশ তাকে নজরদারিতে রাখেন।

১৫ লাখ টাকা বাজেটের অর্থদাতারা: জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার চারজন র‌্যাবকে জানায়, টিপু হত্যা মিশনের ব্যয় নির্ধারণ হয় ১৫ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে কে কত দেবে তাও ভাগ করে দেন মুসা। নয় লাখ টাকা দেন ওমর ফারুক। অবশিষ্ট ছয় লাখ টাকা দেন গ্রেপ্তার কিলার নাছির। এর মধ্যে দুবাইয়ে যাওয়ার আগে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে যান মুসা। হুন্ডির মাধ্যমে আরও চার লাখ টাকা তাকে পাঠানো হয়। বাকি ছয় লাখ টাকা দেশে হস্তান্তরের চুক্তি ছিল।

ওমর ফারুককে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার : টিপু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ওমর ফারুককে গতকাল সন্ধ্যার দিকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন। বহিষ্কারাদেশে সই করেছেন ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।

গত ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরে টিপুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা প্রীতি নামে এক কলেজছাত্রীও গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ছাড়া টিপুর গাড়িচালক মুন্না গুলিবিদ্ধ হন। ওইদিন রাতেই শাহজাহানপুর থানায় নিহত টিপুর স্ত্রী ডলি একটি মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করা হয়। মামলার পর হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ডলি।

টিপু হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর আগে শ্যুটার মাসুম ও আরফান উল্লাহ দামাল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। যারা এখন রিমান্ডে রয়েছে। ডিবির ভাষ্য, মাসুমই টিপুর উদ্দেশে গুলি চালিয়েছিল।

ডিবির হাতে গ্রেপ্তার শ্যুটার মাসুম ও দামালের টিপু হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন বলেন, হত্যাকাণ্ডটি কাটআউট পদ্ধতিতে করা হয়।