গাজীপুরের শ্রীপুরে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে তৈরি পোশাক কারখানার এক শিশুশ্রমিককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার সকালে শ্রীপুর পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের বৈরাগীর চালা গ্রামে আনোয়ারা মান্নান টেক্সটাইল কারখানায় মো. অপু দেওয়ান (১৩) নামে ওই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুটির এক কিশোর সহকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত অপু দেওয়ান মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের পূর্ব শিয়ালদী গ্রামের পলাশ দেওয়ানের ছেলে। আর আটক কিশোরের (১৫) বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর খড়েরের বাড়ি গ্রামে। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা জানায়, গতকাল সকালে কারখানার নিচতলার রিং সেকশনে কাজ করছিল নিহত অপু দেওয়ান। কাজের ফাঁকে জোর করে হাওয়া মেশিনের নল তার পায়ুপথে ঢুকিয়ে দেয় কিশোর সহকর্মী। এতে মুহুর্তের মধ্যেই অপুর পেট ফুলে যায়। তার চিৎকার শুনে কারখানার অন্য কর্মীরা সেখানে ছুটে আসে। তারা অপুকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে ওই হাসপাতালে নেওয়ার পথে অপুর মৃত্যু হয় বলে জানান স্বজনরা।
অপুর মৃত্যুর ঘটনায় আটক কিশোর ছয় মাস আগে ওই কারখানায় চাকরি নেয় বলে জানিয়েছেন কারখানাটির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকালে এক শিফটের কাজ শেষের দিকে। এমন সময় নিচের তলায় হইচই শুনি। দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখি এক লেবার (শ্রমিক) অপুর পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে দিয়েছে। এতে পেটে বাতাস জমে সে নিশ্বাস নিতে পারছিল না। পরে দ্রুত তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জাবেদ পাটোয়ারী জানান, মুমূর্ষু অবস্থায় শিশু অপুকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হচ্ছে বুঝতে পেরে দ্রুত তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলা হয়।
নিহত অপু দেওয়ান তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারখানার পাশে কেওয়া পর্বখ গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদের ভাড়া বাড়িতে থাকত। তাদের প্রতিবেশী নিবা রানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন ছেলে নিয়ে বেশ কষ্টে দিন কাটত অপুর বাবা রাজমিস্ত্রি পলাশ দেওয়ানের। অপু তাদের বড় সন্তান। অপুর আরও ছোট দুই ভাই আছে। তার মা বেশ অসুস্থ, দাদা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। নিরুপায় হয়ে বড় ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে পোশাক কারখানায় চাকরিতে দেন পলাশ দেওয়ান। সে সংসারে ভরসা ছিল। আজ (গতকাল) সকালে শুনছি এমন এক কাণ্ড ঘটেছে। সব ভরসা শেষ হয়ে গেল। এমন হত্যার উপযুক্ত বিচার হওয়া দরকার।’
গতকাল দুপুরে অপুদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারিয়ে বিলাপ করছে তার বাবা-মাসহ অন্য স্বজনরা। মা জোছনা বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘আমার পুতেরে কী করছে গো। আমার পুতেরে আইন্না দেন। কী কষ্ট কইরাই আমার বুকের ধন মরছে গো!’ তিনি কাঁদতে কাঁদতে মাঝেমধ্যেই মূর্ছা যাচ্ছিলেন। এ সময় অপুর দাদা ও ফুফুকেও অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়।
অপুর মৃত্যুর বিষয়ে আনোয়ারা মান্নান টেক্সটাইল কারখানার প্রশাসন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। কারখানার ফটকে গেলেও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারখানায় দায়িত্বশীল কেউ নেই বলে দাবি করেন নিরাপত্তা কর্মীরা। তারা পরে যোগাযোগ করতে বলেন গণমাধ্যমকর্মীদের।
আনোয়ারা মান্নান টেক্সটাইল কারখানার একাধিক শ্রমিক জানান, কারখানাটিতে সাড়ে আটশ নারী-পুরুষ শ্রমিক রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। এদের বয়স বার থেকে ষোল বছরের মধ্যে। অনেকে নানা কারণে ন্যায্য মজুরি পায় না।
অপুর মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে চাইলে শ্রীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ ইমতিয়াজ বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিশুটিকে আটক করা হয়েছে। নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’