অধিক বিনিয়োগের ওপর ধাপে ধাপে মুনাফার হার কমানোর ঘোষণার পর থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।
সবমিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ১৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সেই হিসেবে অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মোট ৭৫ হাজার ২২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এ সময়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ ৪৫ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা পরিশোধ করে সরকার।
সেই হিসেবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি যেমন কমেছে, তেমনি সরকারের নিট ঋণও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয় স্কিম বিক্রি হয়েছে ৭১ হাজার ৫৫ কোটি টাকার। এই সময়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ সরকার ব্যয় করেছে ৫৬ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। ফলে নিট ঋণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি শেষে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্রের নিট ঋণ কমাকে ভালো চোখেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের উচ্চ মুনাফা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। সেই দিক দিয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট ঋণ কমলে সরকারের জন্য ভালো হবে। আবার যেসব গ্রাহক এ খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন তারা নিশ্চয়ই টাকাটা ঘরে রেখে দেবেন না। এই টাকা তারা ব্যাংক, পুঁজিবাজার বা অন্য কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করবেন। ফলে টাকাগুলো সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগবে।’
সঞ্চয় কর্মকর্তারা জানান, ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ১ শতাংশ এবং ৩০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বা এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয় সরকার।
এর পরের মাস থেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ এসেছিল ১১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ কমে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকায় নেমে আসে। নভেম্বরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ এসেছিল ৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এ খাতের বিনিয়োগ আরও কমে ৭ হাজার কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্র বিক্রির চাপ কমাতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেয় সরকার। তারপরও বাড়তে থাকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছিল ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে এ খাতের ঋণ বাড়তে থাকায় ওই অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে সঞ্চয়পত্রের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু ওই লক্ষ্যমাত্রারও বেশি ঋণ আসে অর্থবছর শেষে।
ব্যাংক কর্মীরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণে গত কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে সরকারের ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল।