ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও রপ্তানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও দেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধের মধ্যেই চলতি বছরে মার্চে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৪ শতাংশ রপ্তানি হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যে রপ্তানি আয় হয়েছিল, তার প্রায় সমপরিমাণের আয় এসেছে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের নয় মাসে। শুধু তাই নয়, চলতি অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, আগামী দুই মাসেই তা ছাড়িয়ে যাবে। গতকাল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ সময় থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কারণে বিশ^ এক ধরনের বৈরী সময় পার করছে। এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রায় সব দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ইউরোপে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

সদ্য শেষ হওয়া মার্চে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪৭৬ কোটি ২২ লাখ ডলার, যা আগের বছরের মার্চের তুলনায় ৫৪ দশমিক ৮২ শতাংশ বা ১৬৮ কোটি ডলার বেশি। গত বছরের মার্চে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩০৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার।   

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, টানা চার মাস ধরে রপ্তানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ। একক মাসের হিসাবে গত মার্চে আসা রপ্তানি আয় বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। একক মাস হিসেবে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে, ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছিল আগের মাস জানুয়ারিতে, ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

ইপিবির প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) পাট ছাড়া অন্য প্রায় সব খাতের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ৩ হাজার ৮৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার চেয়ে ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ আয় এসেছে। আর চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ২৫৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। 

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রপ্তানি আয় বাড়াতে বরাবরের মতো প্রধান ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান পণ্য শুধু তৈরি পোশাকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। ইপিবির তথ্যানুযায়ী, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। যদিও গত গত কয়েক মাসের মতো মার্চেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭৯৪ কোটি ডলার বেশি। এ সময় মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।

তৈরি পোশাক পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে নিট পোশাক খাতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত সময়ে নিটওয়্যার পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ হাজার ৭১২ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের শুরুতে নিটের বিপরীতে ওভেন পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হলেও গত কয়েক মাস ধরে তাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৩০ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩২ শতাংশ বেশি।

তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে হোম টেক্সটাইল পণ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ১১৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে। এ আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আলোচিত সময়ে এ খাতের পণ্য রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের। রপ্তানি হয়েছে ২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫০ শতাংশ বেশি।  

চলতি অর্থবছরে তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এ খাতের পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে গত কয়েক বছর ধরেই পিছিয়ে পড়ছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আলোচ্য সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৮৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। এ সময়ে মাছ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪৩ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এ সময় কেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ২৮ কোটি ২১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। এ সময়ে ওষুধ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সব খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।