রাজাপাকসেই থাকছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে গত কয়েক দিন ধরেই বিরোধীরাসহ সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমেছেন সরকারের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভের মধ্যেই গত রবিবার রাতে শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার ২৬ সদস্য একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে এবং তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করেননি। মন্ত্রীদের পদত্যাগের পরেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অজিথ নিভারদ কাবরাল। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, দেশটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়ায় গভর্নর হিসেবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। গত বছরের ১৬ নভেম্বর তিনি শ্রীলঙ্কার ১৬তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।  শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিরর জানিয়েছে, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র নিয়ে মাহিন্দা রাজাপাকসে গতকাল সোমবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেন। এছাড়া গতকাল জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার ডাকে যে বিরোধীরা সাড়া দিচ্ছেন এমনটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে শ্রীলঙ্কায় পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শপথ নিলেন নতুন চার মন্ত্রী। সোমবার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের কাছে শপথবাক্য পাঠ করেছেন তারা। শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাসিল রাজাপাকসের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আলি সাবরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জিএল পেইরিস। এছাড়া দীনেশ গুনাবর্ধনে শিক্ষামন্ত্রী ও জনস্টন ফার্নান্দো মহাসড়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পরও কারফিউ উপেক্ষা করে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে শ্রীলঙ্কায়। বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতা থেকে রাজাপাকসে পরিবারের বিদায় চাইছেন। তারা বলছেন, রাজাপাকসেরা ক্ষমতা না ছাড়লে এই পদত্যাগ অর্থহীন। ডেইলি মিরর বলছে, অধিকাংশ এমপির বাড়ির বাইরেই বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার বড় ভাই। তাদের সবার ছোট ভাই বাসিল রাজাপাকসে ছিলেন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে। আর পরিবারের সবার বড় ভাই চমল রাজাপাকসে কৃষি মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দার ছেলে নামাল রাজাপাকসে ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী। পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রীর ছেলে নামাল রাজাপাকসে টুইট করে বলেছেন, তাদের এই সিদ্ধান্ত সরকার ও জনগণের জন্য ‘স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করবে’। তবে অনেক বিক্ষোভকারীর অভিযোগ, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট এবং তার পরিবারই দায়ী। দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ, কারণ তারা এখনো ক্ষমতায় আছেন। এক টুইটার ব্যবহারকারী পদত্যাগের বিষয়টিকে উপহাস করে লিখেছেন, ‘এটা একটা নোংরা কৌতুক’। আরেকজন একে বর্ণনা করেছেন ‘স্বৈরাচারের খেলার একটি চাল’ হিসেবে।

চলতি বছর কলম্বোকে প্রায় ৬৯০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, অথচ জ্বালানি তেল, খাদ্য, কাগজের মতো নিত্যপণ্য আমদানির মতো যথেষ্ট বিদেশি মুদ্রাও সরকারের হাতে নেই। এ পরিস্থিতিতে দেখা দিয়েছে চরম বিদ্যুৎ সংকট। প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে, বন্ধ রাখতে হচ্ছে সড়কবাতি। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, মার্চে মূল্যস্ফীতি হয়েছে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৮.৭ শতাংশ। খাদপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৩০.২ শতাংশে পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ শুরু হলে কারফিউ জারি করে সরকার। শুক্রবার সকালে ওই কারফিউ তুলে নিলেও শনিবার আবারও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। বিক্ষোভ দমাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে প্রবেশের পথও সীমিত করা হয়।

সিলন টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ১১টি বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা রবিবার সকালে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের সঙ্গে দেখা করে একটি সর্বদলীয় বা বহুদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। দেশটির সাবেক শিল্পমন্ত্রী বিমল বীরাবানসা গত রবিবার বিকেলে কলম্বোতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষ বর্তমান মন্ত্রিসভার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। আমাদের দেশকে নানা বিভেদের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এর সমাধানে আরেকটি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময় আমাদের নেই। সুতরাং সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা। আর এই নতুন সরকার গঠন করতে হবে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে। এ সরকার গঠনের মূল লক্ষ্য হবে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা এবং পরবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।’