রমজান মাস এলেই ইফতারির বাজারে রূপ নেয় ‘অভিজাতপাড়া’খ্যাত রাজধানীর বেইলি রোড। বিকেল থেকেই হরেক রকমের খাবার সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। বাহারি পদের জন্য ক্রেতাদেরও দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় দোকানগুলোর সামনে।
গেল কয়েক বছর ধরে প্রতি রমজানে বেইলি রোডের এই চিত্র স্বাভাবিক হলেও করোনার পর বদলে যায় পরিস্থিতি। টানা দু’বছর বন্ধ থাকায় প্রভাব পড়েছে এবারের ইফতারি বাজারে। ঐতিহ্যবাহী বাহারি সব ইফতারির পদ যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে ক্রেতাদের আনাগোনাও।
গতকাল সোমবার রোজার দ্বিতীয় দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, রমজানের সেই চিরচেনা রূপ নেই। সড়কে নেই কোনো ইফতারসামগ্রী। হাতেগোনা কয়েকটি স্থায়ী দোকানে ইফতারসামগ্রী বিক্রি হলেও তাতে ক্রেতার চাপ নেই বললেই চলে। আর সেসব দোকানে পদের বৈচিত্র্যও কম। আলুর চপ, পেঁয়াজু, ছোলা, মুড়ির বাইরে হালিম, খাসির চাপ, গরুর চাপ, লুচি, কাচ্চি বিরিয়ানি (খাসি), ফিরনি, চিকেন রোস্ট (আস্ত), চিকেন ফ্রাই, চিকেন সমুচা, চিকেন ললি, জালি কাবাব, শিক কাবাব, ভেজিটেবল রোলের মতো প্রচলিত পদগুলোই বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ইফতারি নিতে আসা অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘এক সময় এখানে ইফতারির হাট বসত। বেইলি রোডের ইফতারির সুনাম এখনো রয়েছে। তবে জৌলুস আর নেই। মাত্র কয়েকটা দোকানে ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। তাতে খুব বেশি আইটেমও নেই।’
মৌচাক থেকে ইফতারি কিনতে আসা মালিহা মুমতাজ বলেন, আগে আমদের বাসা বেইলি রোডেই ছিল। করোনার পর বাসা পাল্টে মৌচাকে গিয়েছি। কিন্তু এখানকার ইফতারির যে মজা সেটা অন্য কোথাও পাই না। তাই রমজান এলে প্রতিদিন এখান থেকে ইফতারি নেওয়া হয়। তবে এখন সব পাল্টে গেছে। আমরা চাই আবার আগের রূপে ফিরে যাবে বেইলি রোডের ইফতারি বাজার।’
বেইলি রোডে ইফতারসামগ্রীর অন্যতম আকর্ষণ ‘পিঠা ঘরের’ পিঠা। এ দোকানে সারা বছর পিঠা বিক্রি চললেও রোজা উপলক্ষে প্রায় হরেক পদের পিঠার আয়োজন করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দোকান ঘুরে দেখা যায়Ñ পাকন পিঠা, রসগজা, ঝিনুক পিঠা, পান্তোয়া পিঠা, সূর্যমুখী, শাহী মুগ পাকন পিঠা, লবঙ্গ লতিকাসহ নানা আইটেমের পিঠার পসরা সাজানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. বাসান বলেন, প্রথম রোজায় খুব একটা বেচাকেনা হয়নি। তাই আজকে আইটেম অনেক কম। আগে বিকেল ৩টা থেকে দোকানের সামনে লাইন থাকত। এখন সেই ভিড় আর নেই। আমরা শুধু কর্মচারীদের খরচ উঠানোর জন্য ইফতারির আইটেম বিক্রি করছি। এর বাইরে কোনো লাভ নেই।
কেন ভিড় নেই এমন প্রশ্নের জবাবে বাসান বলেন, বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়তি। এটা অভিজাতপাড়া হলেও অনেকেই খরচ কমিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া এই এলাকায় আগে ইফতারির হাট বসত। মানুষের সমাগম ছিল। এখন দোকানও নেই মানুষও নেই।
বেইলি রোডের আরেক জনপ্রিয় খাবাবের দোকান নবাবী ভোজ। এখানকার ইফতারিও বেশ জনপ্রিয়। গতকাল নবাবী ভোজে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের ভিড়। অনেকেই পরিবারসহ এসেছেন ইফতারি কিনতে। ক্রেতাদের সামলাতে বিক্রেতারাও বেশ ব্যস্ত। দোকানের এক বিক্রেতা বলেন, করোনার পর থেকে রোজায় বেচাকেনা কম। আগে দোকানের সামনে লাইন থাকত। অনেককেই শেষ পর্যন্ত ইফতারি না পেয়ে ফিরে যেতে হতো। এখন আগের মতো ভিড় নেই। আমরাও কম আয়োজন করছি।’
তাওয়া রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক আক্তার আহমেদ বলেন, ‘আমরা সামান্য কিছু আইটেম করেছি। করোনার পর থেকে মানুষ ঘরেই ইফতারির আয়োজন করছে। তাই দোকানে বেচাবিক্রি কম। আবার প্রশাসন সড়কের আশপাশে কোনো দোকান বসতে দিচ্ছে না। বেচাবিক্রিতে তারও প্রভাব পড়েছে।’