মূল বাজারে ক্রেতা সংকট উল্লম্ফনে এসএমই

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর অংশ হিসেবে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন এসইসির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সহায়তা চেয়েও চিঠি পাঠায় এসইসি। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু এসইসির নেওয়া সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে।

কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ না আসায় পুঁজিবাজারের লেনদেন নেমেছে তলানিতে। গতকাল মঙ্গলবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকার, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল ডিএসইতে ৫৫৬ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছিল। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীনির্ভর পুঁজিবাজারে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ না আসায় পতন ধারা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই এসএমই প্ল্যাটফর্মে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে এ প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলোর সর্বোচ্চ দরবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসই এসএমই সূচক প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। মাত্র ১২ কার্যদিবসে সূচকটি বেড়েছে ১৩৮ শতাংশ। এ সময়ে লাখ টাকার লেনদেন গড়িয়েছে ৩৩ কোটি টাকায়। মাঝারি আকারের বিনিয়োগকারীদের জন্য লেনদেনের সুযোগ করে দেওয়ার পর থেকেই এসএমই প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনার হুজুগ তৈরি হয়েছে। ফলে লেনদেন যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রায় প্রতিদিনই কোম্পানিগুলোর শেয়ার সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হচ্ছে।

এসইসি জানিয়েছে, বর্তমানে যে লেনদেন হয়, তার ৮০ শতাংশই ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে গত ২৩ মার্চ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয় এসইসি। চিঠিতে পুঁজিবাজারের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগের অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে বীমা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ নিশ্চিতেও আইডিআরএকে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে বাজার মধ্যস্থতাকারী মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসে কমিশন। ওই বৈঠকে বাজার মধ্যস্থতাকারীরা রমজান মাসে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ফলে তারল্য সংকটে পুঁজিবাজারের লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সপ্তাহের বৈঠকে বাজার মধ্যস্থতাকারীরা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরদিন গত ৩১ মার্চ ডিএসইর লেনদেন কিছুটা উন্নতি হয়ে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু চলতি সপ্তাহের রবিবার থেকে আবারও লেনদেন কমতে শুরু করে ৮৩৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। পরদিন সোমবার লেনদেন আরও কমে ৬২০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আর গতকাল তারল্য সংকট তীব্র হয়ে উঠলে লেনদেন নেমে আসে ৫৭৫ কোটি টাকায়। তবে শেয়ার দরহ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশে নামিয়ে আনায় গতকাল দরপতনের তীব্রতা অনেকটা কম ছিল। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ শেয়ারের দরপতন হলেও প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ২৪ পয়েন্ট। সিমেন্ট, টেলিযোগাযোগ এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাত ছাড়া অন্যসব খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে।

অবশ্য মূলবাজার ধরাশায়ী হলেও ডিএসই এসএমই প্ল্যাটফর্মের কোম্পানির শেয়ার নিয়ে বিপুল আগ্রহ দেখা গেছে। কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনো প্রতিবেদন না থাকলেও বিনিয়োগকারীরা এর শেয়ার ক্রয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের পোর্টফোলিও মূল্য ৫০ লাখ থেকে কমিয়ে ২০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার পর থেকেই এ প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলোতে ঝোঁক বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহে এ প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর ৭০ থেকে ১৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গতকালও এ প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত ১০ কোম্পানির মধ্যে ৯টির দরই ১৪ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে গতকাল এ প্ল্যাটফর্মের সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৭৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। যেখানে মূলবাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানির দর কমেছে, সেখানে এসএমই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হওয়া শতভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর প্রায় সর্বোচ্চ হারে বেড়েছে।

গতকাল এসএমই প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে নিয়ালকো অ্যালয়সের শেয়ারে। এ কোম্পানিতে লেনদেন হয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর দর বেড়েছে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজে, ৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। মাস্টার ফিড অ্যাগ্রোটেকের দরও সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, লেনদেন হয়েছে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এছাড়া গতকাল এক দিনে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশে বেশি দর বেড়েছে ওরিজা অ্যাগ্রো, অ্যাপেক্স ওয়েভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস ও মামুন অ্যাগ্রো প্রডাক্টের শেয়ার দর। ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস ও বেঙ্গল বিস্কুটসের দর বেড়েছে যথাক্রমে ১৮ ও ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।