শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সতর্ক বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় উপনেতা (জিএম কাদের) আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শ্রীলঙ্কার বিষয়টি নিয়ে, এটা বাস্তব। তবে আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে এ পর্যন্ত উন্নয়নের ক্ষেত্রে যত ঋণ নিয়েছি তা সময়মতো পরিশোধ করছি। বাংলাদেশ একটি দেশ, যে দেশ কোনোদিন ঋণ পরিশোধে ডিফল্টার (খেলাপি) হয়নি, হবেও না। সেদিক থেকে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি অনেক মজবুত। সেটা আমি বলে রাখতে চাই। আমরা অত্যন্ত সতর্ক।’
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের ১৭তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের তার বক্তব্যে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের অবস্থাও শ্রীলঙ্কার মতো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ আছে বলেই রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আছে। ভারসাম্য আছে। এটা হলো বাস্তবতা। অন্য পথে যারা ক্ষমতা দখল করতে যায় তাদের কাছে কেন ৭০ অনুচ্ছেদ এই প্রশ্ন উঠবে।’
জিএম কাদেরের সংবিধান নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য হলো এমন একটি দলের থেকে সংবিধানের বিষয় শুনতে হচ্ছে, যে দলটি ক্ষমতায় এসেছিল সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে মার্শাল ল জারি করে। মার্শাল ল’র মাধ্যমে যাদের জন্ম, যার নেতা ক্ষমতাই দখল করেছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে বিদায় দিয়ে সেনাপ্রধান হয়ে গেলেন রাষ্ট্রপ্রধান। যে সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতায় এসেছিল তার থেকে আজকে আমাদের সংবিধান শিখতে হচ্ছে। সংবিধানের ব্যাখ্যা শুনতে হচ্ছে।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একে তো করোনা, তারপর ইউক্রেনে যুদ্ধ। সমস্ত ইউরোপে সাড়ে সাত ভাগের ওপরে মূল্যস্ফীতি। কোনো কোনো দেশে ৮০ ভাগ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি হয়ে গেছে। এটা হয়েছে একটা করোনার ধাক্কায় আরেকটা যুদ্ধের ধাক্কায়। সেখানে বাংলাদেশে ছয় ভাগের নিচে আছে মূল্যস্ফীতি। বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, মাথাপিছু আয়ও যেমন বেড়েছে সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যও বেড়েছে। এটা হলো বাস্তব।’
সময়মতো প্রজেক্ট শেষ না হওয়ার বিষয়ে জিএম কাদেরের বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্ট আট মাস আগে উদ্বোধন করেছি। এতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা বেঁচে গেছে। আমরা প্রত্যেকটি কাজ আগে করি, কিছু টাকা বাঁচাই।’
উন্নয়নে জনভোগান্তির অভিযোগের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, ‘উন্নয়ন তো এ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। এখন হয়তো আপাতত কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এটা (মেট্রো রেল) সম্পন্ন হওয়ার পর উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ৬০ হাজার লোক যাতায়াত করতে পারবে। আজকে আমরা শতভাগ বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম হয়েছি।’
প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনার কারণে জিনিসের দাম বেড়েছে। রড, সিমেন্ট প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সব দেশে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ার জন্য আমেরিকার অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক ডলারের তেল চার ডলার হয়ে গেছে। কোনো কিছুর দাম বাড়লে তার সঙ্গে অ্যাডজাস্টমেন্ট করে নিতে হয়। না হলে আমাদের কাজ সম্পন্ন হবে না।’
নিত্যপণ্যের মূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মোটা চালের দাম এখন ৪৬ টাকার মতো আছে। সেটা খুব বেশি বাড়েনি। চিকন ও মাঝারি চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। আলু পাইকারি বাজারে ২০ টাকা, খুচরা বাজারে ২৫ টাকা। পেঁয়াজের দামের জন্য এখন কৃষক হাহাকার করছে। বেগুনের দাম ১১০ টাকার ওপরে চলে গেল। সেটা এখন কমে ৮০ টাকায় এসেছে। তাই বেগুন দিয়ে বেগুনি না খেয়ে আরও যেসব সবজি সহজলভ্য আছে সেটা দিয়ে খেলেই হয়। আমরা তো তাই খাই। বেগুনি না বানিয়ে মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে খুব ভালো বেগুনি বানানো যায়। আমরা এভাবে করি। সেভাবে করা যায়।’ জিনিসপত্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যাতে বেশি কষ্ট না পায় সেই পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি।’
নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় সেই ব্যবস্থাটা আমরা করেছি।’
‘জিয়াউর রহমানই বঙ্গবন্ধুর আসল খুনি’ : জিয়াউর রহমানই বঙ্গবন্ধুর আসল খুনি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ তার বক্তব্যে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে তার কোনো নাম আসেনি। তিনি এর ধারেকাছেও ছিলেন না।’
শেষ হলো সপ্তদশ অধিবেশন : আট কার্যদিবস চলার পর গতকাল শেষ হলো সংসদের সপ্তদশ অধিবেশন। এদিন বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনানোর মাধ্যমে সংসদ অধিবেশনের ইতি টানেন। এ অধিবেশন শুরু হয় গত ২৮ মার্চ। এ অধিবেশনে নয়টি বিল পাস হয়।