ঘটনাস্থলে না থেকেও আসামি ৪ জবি ছাত্র!

বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হয়ে ক্লাস করতে গত ৩ মার্চ নীলফামারীর গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসেন রওশনুল ফেরদৌস রিফাত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য কোনো আবাসিক হল না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ভবনে ‘টু-লেট’ লেখা ঝুলতে দেখে সেখানকার মেসে ওঠেন রিফাত। তবে মেসে ওঠার ২০ দিন পার না হতেই পড়েন চরম বিপদে। গত ২৪ মার্চ ভোরে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সরকারবিরোধী সেøাগান দেওয়ার অভিযোগে কোতোয়ালি থানা-পুলিশের একটি দল মেসে অভিযান চালিয়ে শিবিরকর্মী সন্দেহে রিফাতসহ ১২ শিক্ষার্থীকে আটক করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয় তাদের। এই ১২ জনের মধ্যে রিফাতের মতো আরও তিন শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে ঢাকায় এসেছেন গ্রেপ্তার হওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিন আগে।

তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়, গ্রেপ্তার হওয়া ১২ জনকে পরে ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরক আইনের আরেকটি মামলায় আসামি দেখানো হয়। অথচ এসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের দাবি, ২০২১ সালে তাদের সন্তানরা ঢাকাতেই ছিলেন না। আর তাদের মধ্যে প্রথম বর্ষের চার শিক্ষার্থী ঢাকায় এসেছে গ্রেপ্তার হওয়ার সর্বোচ্চ ২০ দিন আগে। তাহলে কোন যুক্তিতে পুরনো মামলায় আসামি করা হলো এমন প্রশ্ন এসব শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের।

জানা গেছে, ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার এসআই রাজু মুনশি বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে ইউনুছ রায়হান, জাহিদ বিন মকবুল, নিজাম উদ্দিন মাহমুদ, পারভেজ, এনায়েত, বাপ্পী, এখলাস ও পাথিন নামে কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয় আরও অনেককে। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আটক ১২ শিক্ষার্থীকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের পরিবারের সদস্যদের।

ওই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সামনে মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার সামনে পাকা রাস্তার ওপর উল্লিখিত সাত আসামি ও অজ্ঞাতনামা আসামিরা সবাই জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে একত্র হয়। তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দা, লাঠিসোঁটা, বাঁশ, ইটপাটকেল ও ককটেল বোমায় একটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর ও ককটেল বোমা ফাটিয়ে রাজনৈতিকভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘœ সৃষ্টির চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাধা দিলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ এক নম্বর আসামি ও দুই নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বাকিরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড আইনের ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩৫৩/৪২৭ এবং ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক আইনের ৩ ধারার মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া ১২ জবি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম বর্ষের রিফাতের বাবা মোরশেদুল করিম কল্লোল নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ছেলেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগ থেকেই ছেলে ছাত্রলীগ করত। কখনো শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না।’ এ সময় তিনি তার এলাকার ইউনিয়ন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি দেখান। এতে রিফাতকে ইউনিয়ন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোরশেদুল করিম আরও বলেন, ‘২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার সময় আমার ছেলে ঢাকাতেই ছিল না। নীলফামারীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করছে। প্রথমে ছেলে দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পরে জবিতে ভালো সাবজেক্ট পেলে এখানে চলে আসে। জবিতে ভর্তির পর চলতি বছরের ৩ মার্চ ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে যুক্ত হতে ঢাকায় আসে। অথচ ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী এলাকার এক ঘটনার এমন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যে সময় সে ঢাকাতেই আসেনি।’

শুধু রিফাতের পরিবার নয়, একই ধরনের দাবি করেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থী আলুর রহমান অলির পরিবার। অলির বাবা মো. জাহাঙ্গীর ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

গ্রেপ্তার হওয়া এই শিক্ষার্থীর বড় ভাই আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আমার ভাই এবং আমার বাবাসহ আমাদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের হয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ আমার ভাইকে এ রকম সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমাদের পুরো পরিবার এ নিয়ে চিন্তায় আছে। আমি আমার ভাইয়ের মুক্তি চাই।’

এদিকে পুলিশের অভিযোগ আমলে নিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ১১ শিক্ষার্থীকে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। যদিও এ নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের সাময়িক বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়। যদি আদালত তাদের জামিন দেয় বা তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করা হবে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’