২ এপ্রিল রাত ১টা। ঢাকার কুড়িলে একটি রেস্টুরেন্টে কাজ শেষ করে মোটরসাইকেলে করে ফকিরাপুলের বাসায় ফিরছিলেন আল আমিন ঢালী। রামপুরা ব্রিজের কাছে পৌঁছলে বিপদগ্রস্ত এক ব্যক্তির অনুরোধে তাকে মোটরসাইকেলের পেছনে ওঠান। কিন্তু সেই ব্যক্তিই তাকে অস্ত্রের মুখে নিয়ে যায় কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে। সেখানে মারধর করে তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে যায়।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এরপর আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে আরও বিপদে পড়েন আল আমিন। কেরানীগঞ্জ মডেল থানা, হাতিরঝিল ও রামপুরা থানা ঘুরেও মামলা করতে পারেননি তিনি। সর্বশেষ রামপুরা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ নেওয়া হলেও তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে দাবি করেছেন আল আমিন।
শুধু আল আমিনই নন, প্রায় এমন অসহায় অবস্থায় পড়েন অনেক ভুক্তভোগী। যদিও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, তাৎক্ষণিক মামলা নেওয়ার জন্য প্রত্যেক থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া আছে। তারপরও কেউ যদি তা অমান্য করেন, তাহলে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
আল আমিনের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভিকটিম (ভুক্তভোগী) রামপুরা ব্রিজ থেকে যাত্রী নিয়েছিলেন। এ কারণে মামলা হওয়ার কথা হাতিরঝিল অথবা রামপুরা থানায়। কিন্তু ভিকটিম কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করতে চেয়েছিলেন কি না তা খোঁজ নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। কারও কোনো গাফিলতি থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ও খুনের ঘটনা একটি থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন তা নির্ধারণে বড় পরিমাপক। থানার ওসিকে প্রতি সপ্তাহে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জানাতে হয়। ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হয়। তাই ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা নিতে চায় না থানা পুলিশ। ডাকাতির ঘটনায় দস্যুতার মামলা কিংবা হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিয়েই দায়িত্ব শেষ করে থানা।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক সময় ঘটনা এক থানা থেকে শুরু হয়ে আরেক থানা এলাকা বা দূরের কোনো থানা এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। এই অবস্থায় থানা পুলিশের মধ্যে মামলা নেওয়া নিয়ে ঠেলাঠেলি করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি দূর করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঘটনার শুরু হয়েছে যে এলাকায় সেই এলাকার থানা পুলিশকে মামলা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ভুক্তভোগী থানায় এলে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাকে সব ধরনের সহায়তা করতে হবে। অন্য থানা এলাকার ঘটনা হলেও ভুক্তভোগীকে সহায়তা করতে হবে। প্রয়োজনে থানায় মামলা বা জিডি নিতে হবে।
ভুক্তভোগী আল আমিন জানান, ঘটনার পর তিনি কেরানীগঞ্জ মডেল, হাতিরঝিল ও রামপুরা থানায় গিয়েছিলেন। একটি থানা বিষয়টি তাদের এলাকার আওতায় পড়ে না বলে দায় এড়িয়ে গেছে। অথচ এ ঘটনার কারণে তিনি বিকাশ নম্বর, প্রয়োজনীয় একটি সিমকার্ড তুলতে পারছেন না।
হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশিদ জানান, এলাকাটি রামপুরা থানায় হওয়ায় সেখানে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মতিঝিল জোনের ডিসি আবদুল আহাদ জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। রামপুরা থানায় যদি লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আল আমিনের ঘটনার আগে গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি বাসে নারী ও শিশুদের জিম্মি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। টাঙ্গাইল থেকে কালিয়াকৈর আসার পথে ডাকাতির কবলে পড়া নাইম খান পরের দিন থানায় গেলেও অভিযোগ নেয়নি পুলিশ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টা পর মধ্যরাতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সামনে বাস থামিয়ে ডাকাতরা চলে যায়। ঘটনার পরদিন তিনি থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ তার অভিযোগ নেয়নি। এমনকি থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সড়কে ডাকাতির ঘটনায় এক থানায় মামলা করতে গেলে ঠেলে অন্য থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে চলতি গাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় ‘ঘটনাস্থল আমার এলাকায় নয়’ দাবি করে মামলা নেয় না থানা পুলিশ। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে অনেক ভুক্তভোগী মামলাই করেন না। আবার প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ কিংবা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর কিছু মামলা হয়।
ডাকাতের কবলে পড়া টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শফিকুল থানায় মামলা করতে না পেরে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। ঘটনার ৯ দিনের মাথায় তার মামলা নেয় উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।
গত তিন মাসে মহাসড়কে চারটি বাস ডাকাতির ঘটনার পরপরই থানায় গিয়েও মামলা করতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। থানায় থানায় ঘুরতে হয়েছে তাদের। পরে প্রভাবশালীদের তদবির কিংবা ঊর্ধ্বতন পুলিশের হস্তক্ষেপে মামলা নিতে বাধ্য হয় স্থানীয় থানা পুলিশ।
গত ৯ জানুয়ারি ঢাকার সাভারে ডাকাতির ঘটনার পরপরই আব্দুল্লাহ আল-মামুন নামে এক যুবক মামলা করতে গেলে তা নেয়নি পুলিশ। ঘটনার ২৪ দিন পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ৪ ফেব্রুয়ারি মামলা নিয়েছে সাভার থানা। পর দিন ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা আশুলিয়া থানায় বাস ডাকাতির আরও একটি মামলা হয়। মামলার বাদী জুয়েল নামে এক বাসচালক। অথচ ডাকাতির ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় দুই মাস আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর।
তবে একাধিক জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, মামলা না নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। প্রতিটি থানায় সংশ্লিষ্ট এলাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন নম্বর দেওয়া আছে। কোনো থানা পুলিশ মামলা নিতে না চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে পুলিশের সেবা নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।