যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের জীবন

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেশটির প্রেসিডেন্ট। চার বছর বা দুই মেয়াদে আট বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সাবেক প্রেসিডেন্টরা আর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন না। পরের জীবন কীভাবে কাটান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষেরা? লিখেছেন বিপুল জামান

যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ৪৬ জন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে। জো বাইডেন ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন। এর আগে ৪৫ জন প্রেসিডেন্ট সাবেক হয়েছেন। একজন প্রেসিডেন্ট মেয়াদ পূর্ণ করে সাবেকদের খাতায় নাম লেখাতে পারেন। আবার মাঝপথেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হতে পারে তাকে। ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হতে পারে তিনটি কারণে। মৃত্যু, পদত্যাগ বা অভিশংসন। আটজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকার সময়েই মারা গেছেন। এর মধ্যে চারজন প্রেসিডেন্টআব্রাহাম লিঙ্কন, জেমস গারফিল্ড, উইলিয়াম ম্যাককিনলে এবং জন কেনেডি আততায়ীর হাতে মারা যান। বাকি চারজনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া পাঁচজন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হামলা থেকে নিজেদের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হন। সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, প্রায় ১২ বছর আর সবচেয়ে কম সময় প্রেসডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন। শপথ নেওয়ার এক মাস পর নিউমোনিয়ায় মারা যান সবচেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করা এই প্রেসিডেন্ট। একজন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেছেন, রিচার্ড নিক্সন। তিনজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছেনঅ্যান্ড্রু জনসন, বিল ক্লিনটন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তারা কেউই দোষী সাব্যস্ত হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হননি। জনসন এক ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা হারানো থেকে রক্ষা পান। অবশ্য ক্লিনটন এবং ট্রাম্পকে সিনেটে বড় ব্যবধানে অভিশংসনের বৈতরণী পার হতে হয়।

এখন জীবিত আছেন পাঁচজন সাবেক প্রেসিডেন্ট। তারা হলেনজেমস আর্ল কার্টার জুনিয়র (জিমি কার্টার), বিল জেফারসন ক্লিনটন, জর্জ ওয়াকার বুশ (জর্জ ডব্লিউ বুশ), বারাক হুসেন ওবামা (বারাক ওবামা), ডোনাল্ড জন ট্রাম্প (ডোনাল্ড ট্রাম্প)। এই প্রেসিডেন্টরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পান নানা সুবিধা। ১৯৫৮ সালে পাস হওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বিধি অনুসারে তারা এই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

সুবিধা

প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর বা কোনো কারণে অভিশংসিত হলে হোয়াইট হাউস ছেড়ে দিতে হয়। বাড়ি বদলে যে মোটা অঙ্কের খরচ হয় তা মেটাতে ভাতা পান সাবেক প্রেসিডেন্টরা। সাবেক প্রেসিডেন্টর হোয়াইট হাউস ত্যাগ ও নতুন প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউস আগমনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৯ লাখ ডলার ব্যয় করে থাকে। এই বিপুল অর্থের কিছুটা ছয় মাস পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট পান তার কার্যালয় ও কার্যক্রম বন্ধের ব্যয়বাবদ। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকালে একজন কমান্ডার ইন চিফ চার লাখ ডলার সম্মানী পান। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর সাবেক প্রেসিডেন্টও কিছু কম পান না। সাবেক প্রেসিডেন্টের বার্ষিক ভাতা একজন মন্ত্রিসভা সচিবের সমান, যা ২০১৮ সাল নাগাদ ছিল দুই লাখ এগারো হাজার ডলার। সাবেক প্রেসিডেন্টরা বার্ষিক ভাতা পান তা-ই নয়, অবসরের পর নিজেদের কাজ সামলানোর জন্য যদি তারা কোনো অফিস ব্যবহার করেন, তাহলে সেই অফিস চালানোর জন্য যে লোকবল প্রয়োজন হয় তাও পান। প্রথম যখন তারা ওভাল অফিস ত্যাগ করেন তখন প্রতি বছর এক লাখ পঞ্চাশ হাজার ডলার পান এ বাবদ। অবশ্য এই বরাদ্দ ত্রিশ মাস পরে কমে ছিয়ানব্বই হাজারে দাঁড়ায়। যদিও এটাও কম নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের অফিস বাবদ খরচ সর্বদা বহন করে ইউ এস জেনারেল সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। অফিসের জন্য কত টাকা খরচ করা হবে সে বিষয়ে ইউ এস জেনারেল সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একটি বাজেট পেশ করে। তবে অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো জায়গাকে তার অফিসের স্থান হিসেবে বেছে নিতে পারেন। সে অনুযায়ী বাজেট করা হয় এবং অর্থ বরাদ্দ থাকে। ২০১৭ অর্থবছরে বারাক ওবামা অফিসের স্থানের জন্য চুরাশি হাজার ডলার পেয়েছেন, অপরদিকে বিল ক্লিনটন পেয়েছেন পাঁচ লাখ এগারো হাজার ডলার। কেন্দ্রীয় সরকার অফিসসজ্জার সামগ্রী ও অফিসের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জোগান দেয়। এক্ষেত্রেও খরচের ভিন্নতা দেখা যায়। খরচের ভিন্নতা নির্ভর করে কী ধরনের অফিস এবং অফিস কার্যক্রম কোথায় চালানো হচ্ছে তার ওপর। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা আজীবন সিক্রেট সার্ভিস সুরক্ষা পেয়ে থাকেন। তাদের স্ত্রী ও সন্তানরাও অনুরূপ নিরাপত্তা পান (সন্তানদের বয়স ১৬ না হওয়া পর্যন্ত তারা বিনামূল্যে এই সেবা পান)। অন্যান্য সরকারি কর্মচারীর মতোই সাবেক প্রেসিডেন্টরাও অবসরকালীন স্বাস্থ্যসেবা পান। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তারা তাদের শেষযাত্রা কেমন হবে তাও নির্ধারণ করতে পারেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ছুটি কাটানোর জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা ও সুবিধা বরাদ্দ থাকে।

বই লেখা

অবসরগ্রহণের পর অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বই লিখতে দেখা যায়। তারা মূলত স্মৃতিকথা লিখে থাকেন। এটি হোয়াইট হাউস জীবন ও ওভাল অফিসে দায়িত্বপালনকালে তারা যে সকল জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন সেগুলোর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল তা জনসাধারণকে জানানোর একটি প্রক্রিয়া। বইগুলো নির্দোষ অভিজ্ঞতার বয়ান না হয়ে, বরং তাদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। এই যাত্রায় আছেন বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, ট্রুম্যানের মতো সাবেক প্রেসিডেন্ট। সাবেক ফার্স্ট লেডিরাও লিখেছেন বই; যেমন হিলারি ক্লিনটন। প্রথম পাঁচ মার্কিন প্রেসিডেন্টের চারজনই আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কিন্তু জীবদ্দশায় তা প্রকাশের কথা চিন্তা করেননি। মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হবে, এটা ধরেই তারা আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের স্মৃতিকথামূলক লেখা নিয়ে বই ও চিঠি প্রকাশিত হয়। বইটি সেসময়ে বেস্ট সেলার ছিল। সেসময় দশ হাজার বই বিক্রি হওয়াই অনেক বড় ব্যাপার ছিল। নিজের জীবদ্দশায় আত্মজীবনী প্রকাশ করা প্রথম প্রেসিডেন্ট জেমস বুখানান। দাসপ্রথায় তার ভূমিকাসহ বিভিন্ন কারণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বেশ সমালোচিত। বইটিতে যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী প্রভাবের কারণে সকলকে দোষারোপ করেছেন। তবে সেসময় বইটির বিক্রি ভালো হয়। গৃহযুদ্ধের পর দেশের নীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্যই সেসময় বইটি কেনার হিড়িক পড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম প্রেসিডেন্ট উলিসেস এস গ্রান্টের লেখা ‘পার্সোনাল মেমোয়েরস অব উলিসেস এস গ্রান্ট’ বইটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। উলিসেস এই দুই খণ্ডের বইটিতে গৃহযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশ করেন। গৃহযুদ্ধের পর মানুষের সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে, তখনই গ্রান্টের বইটি পাঠকরা লুফে নেয়। ১৮৭৭ সালে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর লেখক হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না গ্রান্টের। তবে পরবর্তীকালে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অর্থনৈতিক কারণে নিয়মিত লেখালেখির সিদ্ধান্ত নেন। সেসময়ই গ্রান্ট বুঝতে পারেন তিনি লিখতে ভালোবাসেন। সেসময়ে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। ১৮৮৫ সালে গ্রান্টের মৃত্যুর এক বছর পরে বইটি প্রকাশিত হয়। নিজের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও ভুল স্বীকারের কারণে ব্যাপক পাঠক সমাদৃত হয় বইটি। সেসময়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় বই ছিল এটি। বই লিখেছেন হ্যারি এস ট্রুম্যানও। তার বইয়ে তিনি লিখেছেন দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ঘটনার কথা।

কৌতূহল জাগানিয়া বিষয় হলো, অবসরে যাওয়ার পরেই যে সাবেক প্রেসিডেন্টরা বই লিখে থাকেন তা নয়, বরং নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও অনেক প্রার্থী বই লিখেছেন। বারাক ওবামা নির্বাচনী প্রচারণার আগেই একটি বই প্রকাশ করেন। ‘ড্রিম ফ্রম মাই ফাদার’। বইটি সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ। এটি পাঠকের প্রশংসা লাভ করে। ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রস্তুতির সময় ‘দ্য অডাসিটি অব হোপ’ বইটি প্রকাশ করেন। এটি মূলত প্রচারণামূলক বই। অবসরে যাওয়ার পর ২৫টি ভাষায় প্রকাশিত হয় স্মৃতিকথামূলক বই ‘আ প্রমিজড ল্যান্ডের’ প্রথম খন্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টদের লেখা এ সকল বই ইতিহাসের অনেক ঘটনা বর্ণনা করলেও তথ্য বিভ্রাটের দোষে দোষণীয়। যেমনরিচার্ড নিক্সনের প্রথম বইতে তিনি দাবি করেন ১৯৬০ সালের নির্বাচনে জন এফ কেনেডির বিরুদ্ধে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তিনি নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করেননি। এ দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল; নির্বাচনে পরাজয়ের পর ১১টি রাজ্যে ফলাফলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয় রিপাবলিকান পার্টি। এ কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্টের লেখা বইগুলোকে নিখুঁত তথ্যের আকরগ্রন্থ হিসেবে না নেওয়ার জন্য বলেছেন ইতিহাসবিদরা। তবে রাষ্ট্রপ্রধানদের অভিজ্ঞতার আঁচ নেওয়ার জন্য বইগুলো হতে পারে ভালো মাধ্যম। বইগুলোতে প্রেসিডেন্টরা নিজস্ব ধারণা ও বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চিন্তার কথা লিখে যান। আর সে দেশে নাগরিকরাও তাদের প্রেসিডেন্ট কীভাবে চিন্তা করেন, কী বিশ্বাস করেন তা জানার জন্যই দেশটির (সাবেক) প্রেসিডেন্টের লেখা বইগুলো পড়ে থাকে।

প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি

বই লেখার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে তুলে ধরার এ প্রচেষ্টাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন হ্যারি ট্রুম্যান। তার আমলে (১৯৫৫) কংগ্রেস প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাক্ট পাস করে। এই লাইব্রেরিতে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিভিন্ন লেখা, অফিসিয়াল কাগজপত্র ইত্যাদি সাধারণ মানুষ ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। অবশ্য প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি শুরু হয়েছিল ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের হাত ধরে। ব্যক্তিগত সংগ্রহের অনেক কিছুই তিনি এ সংগ্রহশালায় দান করেছিলেন। পরবর্তী প্রেসিডেন্টরা এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে এখন পনের রাষ্ট্রপ্রধানের স্মৃতি সংরক্ষিত আছে। লাইব্রেরিটি ন্যাশনাল আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে।

সাবেক প্রেসিডেন্টদের জীবন

জিমি কার্টার : ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া’স মিলার সেন্টারের মতে, ‘জিমি কার্টার প্রেসিডেন্টের অবসরকালীন জীবনের আদর্শ মডেল স্থাপন করেছেন।’ তিনি ১৯৮২ সালে কার্টার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। কার্টার সেন্টার বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। তিনি হ্যাবিট্যাট ফর হিউম্যানিটি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন। কার্টার সেন্টার আশিটিরও বেশি দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, সহিংসতা নিরসন, রোগ প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। তার এই কাজ পরবর্তী প্রেসিডেন্টদেরও উৎসাহিত করেছে, বিশেষত বিল ক্লিনটনকে। জিমি কার্টার সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকা তথা বিশ্বকে চল্লিশ বছর ধরে সেবা করে চলেছেন। ১৯৯৯ সালে তার এই অবদানের জন্য প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কার্টারকে প্রেসিডেন্ট পদক প্রদান করেন। ২০০২ সালে কার্টার লাভ করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার।

বিল জেফারসন ক্লিনটন : বিল ক্লিনটন হোয়াইট হাউস ত্যাগ করার পর নিউইয়র্কে চলে যান। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট তার দপ্তর স্থাপন করেছিলেন নিউইয়র্ক সিটিতে। হোয়াইট হাউস ত্যাগের পর তিনি বই লিখে ও বক্তৃতা দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে তাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জীবন দর্শন তাকে প্রভাবিত করেছিল। জিমি কার্টারের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাপী মানবতার জন্য কাজ করে যাওয়া দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি উইলিয়াম জে ক্লিনটন প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার অ্যান্ড পার্ক প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও উইলিয়াম জে ক্লিনটন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকটে জনমত গঠন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। এই ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্য সমস্যা, দরিদ্রতা, ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতা নিরসনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করে থাকেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন ২০০৮ সালে বারাক ওবামার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান। ২০১৬ সালে তিনি স্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে প্রচারণা চালান।

জর্জ ওয়াকার বুশ : হোয়াইট হাউস ত্যাগের পর জর্জ বুশ টেক্সাসে বসবাস শুরু করেন। তিনি নিভৃতে ছবি আঁকায় সময় ব্যয় করতে থাকেন। ২০০৯ সালে ডালাসে উদ্দীপনামূলক এক বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে পেশাদার বক্তা হিসেবে তিনি যাত্রা শুরু করেন। ২০১০ সালে তার স্মৃতিকথা ডিসিশন পয়েন্ট প্রকাশিত হয়। বিল ক্লিনটনের মতো জর্জ বুশকেও জাতীয় বিষয়ে মুখর থাকতে দেখা গেছে। ২০১১ সালে ওবামা সরকার ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করলে একে ‘শোচনীয় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।  

বারাক ওবামা :  অবসর নেওয়ার পর ওবামা দুই বছর রাজধানীতে বসবাস করেন ছোট মেয়ে সাসার হাইস্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত। তারপর তারা সপরিবারে শিকাগোতে চলে যান। ওবামা পেশাদার বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ওবামা ফাউন্ডেশন। বারাক ওবামা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না রাখলেও ট্রাম্প সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। করোনা মহামারীর সময়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্নভাবে কাজ করেন।

বিশেষ দায়িত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিছু বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ২০০৯ সালে ক্লিনটন দুজন আমেরিকান সাংবাদিকের মুক্তির সুপারিশ নিয়ে উত্তর কোরিয়ায় যান। ইউনা লি এবং লরা লিংকে চীন থেকে অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশের দায়ে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-ইলের সঙ্গে ক্লিনটনের সাক্ষাতের পর কিম তাদের মুক্তি দেন।

হাইতি ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্লিনটন ও জর্জ বুশকে অনুরোধ করেন দেশটিকে সহযোগিতা করতে। তখন তারা ক্লিনটন-বুশ ফান্ড গঠন করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করতে হয় সাবেক প্রেসিডেন্টদের। ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মানবতাবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ক্লিনটন ও জর্জ বুশ যোগ দেন। ২০১৪ সালে ইউনাইটেড স্টেটস-আফ্রিকা লিডারস সামিটে জর্জ বুশ ও মিশেল ওবামা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর একটি দিনব্যাপী ফোরামের আয়োজন করেন। সম্মেলনে এইচআইভি/এইডসের চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তোলে এমন বৈষম্যমূলক আইন এড়াতে আফ্রিকান নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান জর্জ বুশ। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উদ্যাপনের জন্যও সাবেক প্রেসিডেন্টরা মিলিত হন। প্রতিবছর ৯/১১ ঘটনাকে স্মরণে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাদমূলে বর্তমান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শ্রদ্ধা জানান সাবেক প্রেসিডেন্টরা। গত ৫ এপ্রিল বারাক ওবামা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট ও মেডিকঅ্যাড অ্যাক্ট বিলের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন।