টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর হোসেনের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন এক কলেজছাত্রী। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদনের পাশাপাশি মনজুর হোসেনেকে আইনি নোটিসও পাঠিয়েছেন বাসাইলের ওই তরুণী। ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা মনজুর হোসেন বর্তমানে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন।
কলেজছাত্রীর করা অভিযোগ তদন্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি মাসের ১৪ তারিখের মধ্যে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে ওই কমিটির প্রধান টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহানা নাসরিন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। কলেজছাত্রীর করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাসাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার সময় মনজুর হোসেনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই কলেজছাত্রীর পরিচয় হয়। পরে মনজুর হোসেন ওই কলেজছাত্রীকে তার বাসাইলের সরকারি বাসভবনে নিয়ে যান। সেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। এরই মধ্যে একাধিক জায়গা থেকে ওই কলেজছাত্রীর বিয়ের প্রস্তাব এলেও ইউএনও মনজুর হোসেনের পরামর্শে তা প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে ওই কলেজছাত্রী ও ইউএনও মনজুর হোসেন টাঙ্গাইল শহরের কুমুদিনী কলেজের পাশে পাওয়ার হাউজের পেছনে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তারা দুই মাস থাকার পর কলেজছাত্রী বিয়ের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইউএনও মনজুর হোসেনকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। তখন ইউএনও মনজুর হোসেন ওই কলেজছাত্রীকে বলেন, তারা দুজন ভারত ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। এরপর ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে সরকারি গাড়িতে তারা বেনাপোল সীমান্তে যান। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য যান ভারতে। গাড়িচালক বুলবুল হোসেন ও দুই আনসার সদস্য তাদের বেনাপোল পৌঁছে দিয়ে আসেন। পরে ওই বছরের ১২ অক্টোবর তারা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ভারতে অবস্থানকালেও ইউএনও একাধিকবার কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হওয়ার পরও ইউএনও মনজুর হোসেন কলেজছাত্রীকে স্ত্রীর মর্যাদা দেননি। ফলে বাধ্য হয়ে বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে কলেজছাত্রী গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ১৪ মার্চ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনকে একটি চিঠি পাঠায়। যেখানে এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মনজুর হোসেন ও কলেজছাত্রীকে বেনাপোলে নামিয়ে দিয়ে আসার গাড়ির চালক বুলবুল হোসেন বলেন, ‘আমি শুধু আমার তৎকালীন বসের হুকুম পালন করেছি। আমি ওই কলেজছাত্রীসহ তিনজনকে বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছি। এর আগেও ওই নারী ইউএনও স্যারের বাসভবনে এসেছিলেন।’
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউএনও মনজুর হোসেন আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন। মনজুর হোসেন বিবাহিত হয়েও তিনি অবিবাহিত পরিচয় দিয়েছেন। আমি সরল মনে তার কথা শুনে বিশ্বাস করেছি। তিনি শুধু আমাকে ব্যবহারই করেছেন, সামাজিকভাবে স্ত্রীর মর্যাদা দেননি। আমি আমার প্রাপ্য অধিকার চাই।’
এ প্রসঙ্গে কলেজছাত্রীর মা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউএনও মনজুর হোসেন আমার মেয়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আমরা সামাজিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার মেয়ে কলেজে যেতে পারছে না। আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এর সঠিক বিচার চাই।’
মোবাইল ফোনে কল করে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও মনজুর হোসেন বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে ‘আমি দেখতেছি’ বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ধরেননি।
বাসাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউএনও মনজুর হোসেন বাসাইল থেকে চলে যাওয়ার পর আমাকে একদিন ফোন করে বলেন, একটি মেয়ে আমার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছে। বিষয়টি আপনি একটু দেখেন। আমি ওই মেয়ের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমি আইনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।’
কলেজছাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহানা নাসরিনকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে বলা যাবে কে দোষী, কে নয়। আগামী ১৪ তারিখের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’