দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘অপজিশন বলতে দুটো পার্টি আছে। দুটোই একেবারে সংবিধান লঙ্ঘন করে, আর্মি রুলস ভঙ্গ করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী মিলিটারি ডিকটেটরদের হাতে গড়া। জনগণের কাছে তাদের অবস্থান নেই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কাজেই তাদের ঠিক মাটি ও মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্ক থাকে, সেই সম্পর্কটা তাদের মাঝে নেই। তাদের কাছে ক্ষমতাটা ছিল একটা ভোগের জায়গা। সেই ক্ষেত্রে আসলে অপজিশন তাহলে কোথায়? এখানে একটা পলিটিক্যাল সমস্যা কিন্তু আছে।’ গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সরকারপ্রধান বলেন, ‘গণতন্ত্রের কথা বলতে গেলে অনেক দল দরকার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, উন্নত বিশ্বে দেখলে আপনারা দেখবেন সেখানে কিন্তু মাত্র দুই দল হয়ে গেছে এখন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই দলের বেশি শক্তিশালী দল নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবার নির্বাচনে আমি তো জানি আমেরিকার প্রায় ২৫ শতাংশ সংগঠন ইলেকশনই করে না। ইলেকশন করার বিষয়ে একটা অনীহা চলে আসে মানুষের। এটাও কিন্তু অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশটা ধীরে ধীরে ওরকম হয়ে যাচ্ছে।’
বিগত বিএনপি-জামায়াত আমলের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘পেছনে থেকে তাদের উৎসাহ দিয়ে একবার ক্ষমতায় আনতে পারে, যেটা ২০০১ সালে এনেছিল। কিন্তু তার পরিণতি কী ছিল? বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, বাংলাভাই সৃষ্টি, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, ৫০০ জায়গায় এক দিনে বোমা হামলা, অপজিশনে থাকা আমাদের ওপর গ্রেনেড হামলা, অপজিশনের অনেক নেতাকর্মীর ওপর হামলা।’
তিনি বলেন, ‘এরকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সেই সময় দেশজুড়ে ঘটেছিল যার জন্য ইমার্জেন্সি এলো, এটা হলো বাস্তবতা।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাটা যদি মানুষকে ঘিরে হয়, মানুষের কল্যাণমুখী হয়, সেই রাজনীতি কিন্তু টিকে থাকে, সেটাই চলে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘একমাত্র আওয়ামী লীগ একটা দল, যে দলটা সেই ১৯৪৯ সালে তৈরি। বিরোধী দল থেকে একেবারে সাধারণ মানুষকে নিয়ে এই দলটা গড়ে তোলা। এ সংগঠনের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারে এলে এ দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়। কারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই এ সংগঠনটা তৈরি। কাজেই আমাদের চিন্তা-চেতনাটা ওখানেই থাকে।’
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার জন্য যতটুকু সম্ভব খাদ্য উৎপাদনে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশবাসীর প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারীর দুটি তরঙ্গের পরে, এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব আরেকটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাই আমাদের নিজেদের ব্যবস্থা তৈরি রাখতে হবে এবং সেজন্য এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা উচিত নয় বরং আমরা যে যা করতে পারি তা উৎপাদন করতে হবে।’
সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে সরকারপ্রধান বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত তার জমি থেকে কিছু না কিছু উৎপাদন করা যা শুধু তাদের চাহিদাই মেটাবে না, দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর হতেও সাহায্য করবে।’
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, রাষ্ট্রদূত-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমম্বয়ক জুয়েনা আজিজ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সঞ্চালনায় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গত তিন বছরের কাজের ওপর একটি বিবরণ উপস্থাপন করেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা সারা বিশ্বে ঘটেছে এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। আমরা এখন যা করতে পারি, আমাদের জনগণকে এক ইঞ্চি আবাদযোগ্য জমি ফেলে না রখার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এর মানে আমাদের সর্বদা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারীর শুরুতে বিশ্ব খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলাম। এ কারণেই সেই সময় থেকে আমি মানুষকে তাদের আবাদযোগ্য জমির প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেছি।’
তবে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জন্য সমস্যা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা পণ্য। এ প্রসঙ্গে তিনি এলএনজি ও জ¦ালানি তেলের কথা উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ জিনিসগুলোর দাম বৃদ্ধির ফলাফল সম্পর্কে চিন্তা করতে এবং বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপদ করতে আমাদের এখনই এর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি কর্মকর্তাদের যুদ্ধের পরে অজানা ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়ার জন্য করোনাভাইরাস মহামারী সময়ের মতো সতর্কতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধের পরে অনেক সমস্যা হবে, তা এড়াতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং আমাদের (বিদেশি) রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে হবে। আমাদের অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। দেশের প্রতিটি গ্রামের উন্নয়ন করতে হবে এবং সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে যাতে মানুষ গ্রামে বসেই তাদের জীবন-জীবিকা চালাতে পারে।’
ক্ষমতায় থাকা ও দেশ পরিচালনার বিষয়টিকে একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আমার সবসময়ের লক্ষ্য দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এর মাধ্যমে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প দেশকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত করতে অনেক সাহায্য করবে।’
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য যেমন বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করেছে তেমনি কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। আমরা প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবিলা করতে এবং দূর করতে নিয়মিত বৈঠক করছি।’
একাংশের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পত্রপত্রিকার লেখালেখি পড়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি না, এটাই বাস্তবতা। কারণ তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে, এরকম একটা কথা রটাচ্ছে। আমরা উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা নিচ্ছি এটা ঠিক। কিন্তু সবসময় আমাদের একটা হিসাব থাকে। আমরা কিন্তু ডিফল্টার না। আমরা যেখান থেকে যত ঋণ নিয়েছি প্রত্যেকটা ঋণ আমরা কিন্তু সময়মতো পরিশোধ করেছি। আমরা কিন্তু যত রকম দুর্দশা হোক, এমনকি করোনার মাঝেও আমরা কিন্তু ঋণখেলাপি হইনি।’ বাসস