কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার বিকেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বাড়ির বারান্দায় টিনের চালা লাগানোর সময় বজ্রপাতে এক কাঠমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন। এর আগে সকালে ঝড়ে উপজেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় ঘটে। বিভিন্ন স্থানে গাছপালা পড়ে, খুঁটি ভেঙে, বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভেঙে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গত রবিবার মধ্যরাতে ঝড়ে কালবৈশাখী ও শীলাবৃষ্টিতে লন্ডভন্ড হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন। ঠাকুরগাঁওয়ে ঝড়ে ও শিলাবৃষ্টিতে ফল-ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈল উপজেলায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ, আম-লিচু, করলাসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ভুট্টা, মরিচ, আম ও লিচুর। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে:
কমলগঞ্জে বজ্রপাতে কাঠমিস্ত্রির মৃত্যু : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বাড়ির বারান্দায় টিনের চালা লাগানোর সময় বজ্রপাতে এক কাঠমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মছদ্দর মিয়া (২৫)। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার বিকেলে উপজেলার কাউয়ারগলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, কাউয়ারগলা গ্রামের জলিল মিয়ার বাড়ির বারান্দায় টিনের চালা লাগানোর সময় বজ্রপাত হলে মছদ্দর মিয়ার শরীরের একাংশ ঝলসে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ সময় ফরিদ মিয়া (৬০) ও উত্তম আলী (৪০) নামে আরও দুজন আহত হন। তাদের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশেকুল হক বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নিহত কাঠমিস্ত্রির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’
এর আগে গতকাল সকালে কালবৈশাখীতে উপজেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় ঘটে। বিভিন্ন স্থানে গাছপালা পড়ে, বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে, তার ছিঁড়ে ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভেঙে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সোমবার সারা দিন স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়।
মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক মীর গোলাম ফারুক বলেন, ৩৩ কেভি প্রধান বিদ্যুৎ লাইন কয়েক দফা বন্ধ থাকায় সোমবার দিনে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। তবে বিকেল থেকে পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।
ল-ভ- নাসিরনগর : কালবৈশাখী ও শীলাবৃষ্টিতে ল-ভ- হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন। গত রবিবার মধ্যরাতে ঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাঁচা ঘরবাড়ি, ভেঙে পড়েছে অনেক গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি। গাছপালা ভেঙে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক রাস্তা। শীলাবৃষ্টিতে পাকা ধান ঝরে পড়েছে। এর মধ্যে চাতলপাড়, গোয়ালনগর, কুন্ডা, নাসিরনগর সদর বুড়িশ^র ও পূর্বভাগ, ভলাকুট ইউনিয়নে ক্ষতি হয়েছে বেশি।
বেরুইন গ্রামের পল্লীচিকিৎসক রফিকুল ইসলাম খান জানান, ঝড়ে তার নিজের ঘরসহ বেরুইন মধ্যপাড়া জামে মসজিদটি ভেঙে চালা উড়িয়ে নিয়ে গেছে। ভলাকুট ইউনিয়নের খাগালিয়া গ্রামের পোলট্রি খামারি মো. সুরুজ মিয়া জানান, গ্রামের বরকত উল্লাহ ও মিজান মাস্টারের তিনটি পোলট্রি খামার ভেঙে চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে। শীলাবৃষ্টিতে খামারের সব মুরগি মরে গেছে। এতে তিন খামারির প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বেলুয়া গ্রামের মঙ্গল মিয়ার স্ত্রী আরা বেগমকে জানান, দুই লাখ টাকা ঋণ করে তার ছেলেরা ধান চাষ করেছিল। শীলাবৃষ্টিতে জমির ধান ঝরে গেছে।
ভলাকুট ইউপির চেয়ারম্যান মো. রুবেল মিয়া জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় আড়াইশো কাঁচা ঘরবাড়ি, বাজারের দোকানপাট, স্কুল ও ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পূর্বভাগ ইউপি চেয়ারম্যান মো. আক্তার মিয়া জানান, তার ইউনিয়নে আকাশী হাওরে প্রায় ৩০০-৪০০ কানি জমির পাকা ধান শীলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার জানান, ঝড়ের কারণে বেশ কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও তার ছিঁড়ে গেছে। ফলে সারা দিন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এ পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ কাঁচাঘর, দোকান, স্কুল, মসজিদ ও খামারের তালিকা তার হাতে এসে পৌঁছেছ। তবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে আরও প্রায় ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ তারেক বলেন, এ পর্যন্ত আমরা ১২০ হেক্টর বা ৮৫০ কানি জমির তালিকা করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বিআর আটাশ ও বিআর উনত্রিশ ধানের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ফল-ফসলের ব্যাপক ক্ষতি : ঠাকুরগাঁওয়ে ঝড়ো হাওয়াসহ শিলাবৃষ্টিতে ফল-ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈল উপজেলায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ, আম-লিচু, করলাসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ভুট্টা, মরিচ, আম ও লিচুর।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, তার এক একর জমির ভুট্টা ও ৫ কাঠা জমির মরিচ মাটিতে শুয়ে পড়েছে। অর্থ ও পরিশ্রমের ফসল মাত্র ৩০ মিনিটেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। শুধু আব্দুল জলিলই নন, তার মতো জেলার তিন উপজেলার ৫ সহস্রাধিক কৃষকের একই অবস্থা।
রাণীশংকৈলের ফুটানি টাউন গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, এক একর জমিতে আমের বাগান ছিল। শিলের আঘাতে ডালপালা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে। এ ছাড়া ধান, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল ছিল প্রায় ১০ বিঘা জমিতে। তাও নষ্ট হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, জেলার পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি হয়।
কৃষি কর্মকর্তা আবু হোসেন বলেন, জেলার পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় শিলাবৃষ্টিতে ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
সখীপুরে সরকারি স্কুল বিধ্বস্ত : টাঙ্গাইলের সখীপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত রবিবার সন্ধ্যায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার জামালহাট কুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবনটি বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যালয়ের বেঞ্চ-চেয়ার, টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরের বরাদ্দ ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪০ হাত টিনশেড এ ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া একটি পাকা ভবন রয়েছে, যা ইতিমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে।
বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলে, ‘আমাদের স্কুলের ভবনটি পুরাতন হয়ে গেছে, এখানে ক্লাস করতে ভয় করে। ভবনের ছাদ থেকে বালি খসে পড়ে। জানালা ভাঙা। টিনের একটি ঘর হয়েছিল, সেটিও ঝড়ে ভেঙে দিল।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস নিই। টিনশেড ঘরটি নির্মাণ হওয়ার পর যেটুকু সুবিধা পেয়েছিলাম তা আর রইল না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নেওয়া খুবই বিপজ্জনক।’ কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত নতুন ভবনের দাবি জানান তিনি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রাফিউল ইসলাম বলেন, খবর পেয়েই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া উপজেলার কালিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের সাতজন কলাচাষির ২ হাজার ৪০০ কলাগাছ ভেঙে পড়ে। এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষকরা জানান।
কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, রবিবার সন্ধ্যার ঝড়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একাধিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ঘরও ঝড়ে উড়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মণ বলেন, ‘উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করছি।’