লিবিয়ায় বন্দি ছেলে উদ্ধারে মায়ের দুঃসাহসিক অভিযান

অভাবের সংসারে সচ্ছলতার আশায় বসতভিটার একটি অংশ বিক্রি করে একমাত্র ছেলে ইয়াকুবকে লিবিয়া পাঠান মা শাহিনুর বেগম। লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে অপহৃত হন ইয়াকুব। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ছেলের সন্ধান না পেয়ে পাগলপ্রায় মা নিজে লিবিয়া গিয়ে মাফিয়াদের কাছ থেকে ছেলেকে উদ্ধার করে দেশে ফিরে এসেছেন। ইয়াকুবের সঙ্গে অপহরণের শিকার অন্তত ২৫০ বাঙালিকেও উদ্ধার করা হয়েছে। মা শাহিনুর বেগমের দুঃসাহসিক অভিযান ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত কুমিল্লায় সাড়া ফেলেছে। গত ২১ মার্চ ছেলেকে নিয়ে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে ফেরেন শাহিনুর বেগম।

সরেজমিনে গত সোমবার কালিকাপুর গিয়ে শাহিনুরের বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা যায়। ছোট টিনের ঘরে কোনো রকমে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসবাস করেন শাহিনুর। ছেলেকে উদ্ধারের আশা দেখিয়ে দালালরা কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা ঋণের বোঝায় চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে পরিবারটি।

শাহিনুরের স্বামী আবুল খায়ের আগে থেকেই লিবিয়া থাকেন। ২০১৯ সালে সেখানে পাড়ি জমান ছেলে ইয়াকুব। বাবা-ছেলের আয়ে দেশে থাকা মা আর দুই বোনের সংসার ভালোই চলছিল। তবে আরও আয়ের আশায় হবিগঞ্জের এক দালালের খপ্পরে পড়ে ইয়াকুব। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিনিসহ অন্তত ১৫০ বাংলাদেশি অপহরণের শিকার হন।

ছেলের সন্ধান না পেয়ে প্রবাসী স্বামীর সহায়তায় পাসপোর্ট ও ভিসা করে নিজেও লিবিয়া যান শাহিনুর। তার আগেই ছেলের সন্ধানে দালালদের হাতে প্রায় ২০ লাখ টাকা দেন তিনি। গত ৯ জানুয়ারি ঢাকা ছাড়েন শাহিনুর। সেখানে নানা মাধ্যমের সহায়তা নিয়ে গত ২১ মার্চ ইয়াকুবকে নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

শাহিনুর বেগম জানান, লিবিয়া গিয়ে ব্যাঙ্গাজি শহরে স্বামীর কাছে ওঠেন। বাংলা জানেন এমন কয়েকজনকে খুঁজে তাদের কাছে ঘটনা সব জানান। তারাই শাহিনুরকে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। কর্মকর্তারা সব শুনে সহায়তা করেন। আইওএম কর্মকর্তারা লিবিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াকুবকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন।

তিনি বলেন, ‘ছয় মাস বন্দি জীবনে অনাহার-অর্ধাহার আর নির্যাতনে ইয়াকুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের কাছে থেকে টাকা নেওয়া দালালদের একজন দেশে আছে। তার বাড়ি সিলেটে। আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

ইয়াকুব বলেন, ‘আমাকে খুব অত্যাচার করা হতো। খাওয়ার জন্য একটি রুটি আর পানি দেওয়া হতো। বন্দি শিবিরে আমাদের দেখাশোনা করত সাত বাংলাদেশি। তাদের একজনের নাম সুজন। বাকিদের নাম মনে নেই। তারাও নাকি মাফিয়াদের হাতে অনেক আগে ধরা পড়ে এখন বিশ্বস্ত হয়েছে। তারাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন করেছে।’