দুই দশকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা বৈশাখের বাজার করোনা মহামারীর কারণে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছিল। গত দুই বছরে ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আলাদা করে কোনো ব্যবসা করতে পারেননি। চলতি বছর বৈশাখের সেই আমেজ ফিরতে শুরু করলেও পহেলা বৈশাখ ও রোজার ঈদ কাছাকাছি থাকায় আলাদা করে বৈশাখের কেনাকাটা চোখে পড়ছে না। প্রচ- গরম আর যানজটের কারণেও ক্রেতাদের অনেকেই বিমুখ।
আবহমান কাল থেকে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বাংলা সালের প্রথম দিনটিকে আলাদাভাবে উদযাপনের যে রেওয়াজ ছিল তাও রোজার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বাজারে যেমন ইলিশের খুব কাটতি নেই, তেমনি লাল-সাদা বা রঙিন শাড়ি-পাঞ্জাবিও খুব একটা কদর পায়নি এ বছর। করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে টেপা পুতুল, হাতপাখা, গুহাচিত্র, বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের মোটিফের আলপনাসংবলিত পোশাকের একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এ বছর দেশীয় পোশাক খাতের বড় বড় উদ্যোক্তা সেই সাহস দেখাতে পারেননি। বর্ণিল পোশাকের ‘কালেকশন’ রয়েছে অধিকাংশ পোশাক ব্র্যান্ড শপগুলোতে কিন্তু সেগুলো মূলত ঈদকে কেন্দ্র করে তোলা।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার বাংলা ১৪২৯ সালের প্রথম মাস অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন। দিনটি উপলক্ষে সারা দেশে সরকারি ছুটি থাকে। করোনার আগের বছরগুলোতে এই দিনটিতে রমনার বটমূলে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হতো মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশ এলাকা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকত উৎসবমুখর। তাছাড়া পান্তা-ইলিশের আয়োজনেও জমজমাট থাকত রেস্তোরাঁগুলো। করপোরেট গিফট পাঠানোর রেওয়াজও গড়ে উঠেছিল। তবে দুই বছর করোনার ধকল কাটিয়ে ওঠা নিম্ন-মধ্যম আয়ের এই দেশে এবার সেই আয়োজন একেবারেই নেই বললে চলে।
রাজধানীর বড় বড় বিপণিবিতান ঘুরে পোশাকের দোকানগুলোতে দেখা মেলেনি বৈশাখের জন্য তৈরি করা নতুন নতুন পণ্য। বেশিরভাগ পোশাকই আগের বছরগুলোর স্টক। বিক্রেতারা বলছেন, সামনে ঈদ। ক্রেতারা ঈদের পোশাকই খুঁজছেন। এ কারণে বৈশাখের সংগ্রহ কিছুটা কম।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রোজার কারণে বৈশাখ উদযাপনে অনেকেই আলাদাভাবে কোনো কিছু করছেন না। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। তাদের অনেকেই এসেছেন পোশাক কিনতে। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে দেশি দশে পোশাক কিনতে আসা এক ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা বরাবরই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি। এ বছরও পরিবারের সবাইকে বৈশাখ উপলক্ষে পোশাক কিনে দিয়েছি।’
তবে করপোরেট সংস্কৃতির কারণেও বৈশাখের পোশাকের কিছু চাহিদা রয়ে গেছে। এমন এক ক্রেতা সময় টেলিভিশনের সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার গোলাম রাব্বী বলেন, ‘আমাকে পহেলা বৈশাখ টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করতে হবে। ওইদিন সব নিউজ প্রেজেন্টারই বৈশাখের বর্ণিল পোশাক পরবে। আমাকেও সেজন্য বৈশাখের পোশাক কিনতে হয়েছে।’
যমুনা ফিউচার পার্কেও গতকাল পোশাকের দোকানগুলোতে বৈশাখের পোশাক কিনতে তেমন ভিড় করতে দেখা যায়নি ক্রেতাদের।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই বছরে করোনায় সামগ্রিকভাবে মানুষের খরচ করার প্রবণতা কিছুটা কমেছে। মানুষ এখন কিছুটা হিসাব করে কেনাকাটা করে। তাদের মনের মধ্যে একটি আশঙ্কা রয়েছে, আবার কখন করোনার নতুন ধরন দেখা দেবে তার ঠিক নেই।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার আগে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পোশাক, জুতা ও অন্যান্য সাজসজ্জার প্রসাধনী বিক্রি হতো ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার। এবার সেটা কমে ৪০০-৫০০ কোটি টাকায় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।’
এর কারণ হিসেবে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, ‘একে তো রোজা। তার ওপর অসহনীয় যানজট। গত দুই বছরে করোনার কারণে মানুষের আয়-রোজগারও কমেছে। মানুষের মনে স্বস্তি নেই। এ কারণে বৈশাখের বাজার তেমন জমেনি।’ তিনি অবশ্য মনে করেন ঈদের বাজারও এ বছর খুব জমবে না, ‘বৈশাখ আর ঈদ কাছাকাছি সময়ে পড়ে যাওয়ায় অনেকে শুধু ঈদের পোশাক কিনবে। আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের থেকে কমেছে। এ কারণে ঈদের বাজার নিয়েও আমরা খুব একটা আশাবাদী হতে পারছি না।’
দেশীয় পোশাকের বেশ পুরনো ব্র্যান্ড অঞ্জন’স। গত ২৭ বছর ধরে দেশে পোশাকের ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। অঞ্জন’সের বসুন্ধরা সিটি শাখার ইনচার্জ রেজাউল করিম বলেন, ‘ঈদের পাশাপাশি আমরা বৈশাখেরও কালেকশন দোকানে তুলেছি। ক্রেতাও আছে। তবে তুলনামূলক কম। কিছু সনাতন ধর্মাবলম্বী ক্রেতা বৈশাখের পোশাক কিনছেন। মুসলমানদের অনেকেই রঙিন পোশাক কিনছেন। যা দিয়ে বৈশাখ ও ঈদ দুটো উৎসবই উদযাপন করা যাবে।’
একই অবস্থা আড়ংয়ের মতো প্রসিদ্ধ ব্র্যান্ডেরও। এবার বৈশাখের কালেকশনে আলাদা কোনো নজর দিতে পারেনি তারা। বৈশাখের বেচাকেনাও তেমন হচ্ছে না বলে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এবার বৈশাখের করপোরেট গিফট দেওয়ার প্রবণতাও কম। মিষ্টির দোকানেও অর্ডার কম। হালখাতার আয়োজনও হচ্ছে না রোজার কারণে। এর মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম আছে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক হালখাতা করবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির এমডি মো. ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এবার রোজার কারণে ২০ এপ্রিল হালখাতা করব। রোজার কারণে খাবারদাবারের আয়োজন না থাকলেও প্যাকেট ইফতারির আয়োজন থাকবে।’