দীর্ঘ ১৮ বছর প্রতীক্ষার পর আলোচিত অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় হয়েছে আজ বুধবার। কিন্তু ওই মামলার নির্যাতনের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ ছাত্র আবু আব্বাসের প্রশ্ন, তার ওপর অমানবিক নির্যাতনের বিচার কী তিনি পাবেন?
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার ঘটনায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আবু আব্বাস ভূঁইয়াকে ধরে রমনা থানায় নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ; হামলার দায় স্বীকার করাতে চালানো হয়েছিল নির্যাতন, সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন আব্বাস।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হলে পর দিন এর প্রতিবাদে মিছিল করে ছাত্রলীগ। সেখান থেকেই আটক করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া আব্বাস।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন পরিবারের বড় ছেলে আব্বাস। চার বোন আর দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, তবে আব্বাস যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, তখনই তার বাবা মারা যান।
অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পড়তে এসে ওই একটি ঘটনাই তার জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। এখনো সেই নির্যাতনের কথা ভুলতে পারেননি আব্বাস। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভারী হয়ে আসে আব্বাসের কণ্ঠ।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারী গলায়ই বলেন, স্যারের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছিল, আমি ছিলাম এনেক্স ভবনের সামনে। এনেক্স ভবনের সামনে থেকে ঢাকা মেডিকেলের সামনে ঘুরে গেলাম। দেলোয়ার (আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক) ভাই সঙ্গে ছিল, আমাকে সেই জায়গা থেকে অ্যারেস্ট করছে।
‘আমি তখনো জানি না, হুমায়ুন আজাদ স্যারের মামলায় আমাকে অ্যারেস্ট করবে। আমি ভাবছি পিকেটার হিসাবে অ্যারেস্ট করছে।’
আব্বাস বলেন, ‘রমনা থানায় নিয়ে গেল। চোখ বেঁধে ফেলল। মনে হল, আমাকে একটা বাক্সের মধ্যে ঢুকায় ফেলল। তখন লাঠি দিয়ে মাইর শুরু হইল। আমি বললাম, আমার কী অপরাধ, আমাকে মারতেছেন কেন?
‘থানায় নেওয়ার পর থাইকাই সমানে লাঠি দিয়া পিডাইতাছে। বলতেছে, তোকে স্বীকার করতে হবে, হুমায়ুন আজাদ স্যারকে তুই হামলা করছস।’
অনেককে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও আব্বাসকে ছাড়া হয়নি।
‘আমাকে কেন এই মামলায় অ্যারেস্ট করবে? হুমায়ুন আজাদ স্যারের সঙ্গে তো আমাদের আদর্শিক কোনো বিরোধ নাই, আমার সংগঠনের আদর্শিক কোনো বিরোধ নেই। এরপরও তারা আমাকে নির্যাতন করেই যাচ্ছিল।’
সেই নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্বাস বলেন, ‘আর কী বলমু বলেন, বলতে গেলে আমার কান্না আইসা পড়ে। তারা বলে, আমাকে স্বীকার করতেই হবে। আমার চোখ বাঁধা, আর হাতও পিছমোড়া করে বানছে। তখন আমি কানতেছি, আর আমাকে পিডাইতেই আছে, আর বলতেছে, তোরে স্বীকার করতে হবে। তারপর, একটু পরে আমারে ঝুলায় দিল। মানে পা ওপরে দিয়ে মাথা নিচে দিয়ে ঝুলায় দিল। ঝুলায় দিয়ে মারতেছে আর বলতেছে, স্বীকার করতেই হবে। আমি কানতেছি আর চিল্লাইতেছি।’
আব্বাস প্রশ্ন রাখেন, আমাকে মারতেছেন কেন? তারা বলেন, না, তোকে স্বীকারোক্তি দিতে অইব। একপর্যায়ে আমি প্রায় অজ্ঞান। এরপর আমাকে নামাইল। আমি ভাবলাম, এবার বাঁচলাম। নিচে বসায়া তারা আমার আঙুলে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারা শুরু করল। আমার চোখ তখনো বাঁধা। মনে হল আঙুল দুই-তিনটা ভাঙছে। বলতেছে, তোর স্বীকার করতেই হবে, তুই আজাদ স্যাররে ইয়ে করছস, কালকে কোর্টে যামু, রিমান্ড শুনানি। তখন তোর স্বীকার করতে হবে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে।
আব্বাসকে সে বছরের ১ মার্চ হুমায়ুন আজাদ হত্যা চেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় রমনা থানা-পুলিশ।
তিনি জানান, রিমান্ড শুনানির জন্য তাকে সে সময় আদালতেও তোলা হয়নি, কোর্ট হাজতে রেখেই শুনানি হয়েছে। কিন্তু কাগজে কোর্টে তোলার কথা বলা হয়েছে। এরপর রিমান্ডে নিয়ে শুরু হয়েছে ফের নির্যাতন। আমি বলি, আমাকে মারেন, মাইরা ফালান। এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, আমি স্বীকার করুম না।
‘আমি তাদের বলছি, আমি ছাত্রলীগ করি, মিছিল করছি, আপনি আমাকে এই অপরাধে মামলা দিতে পারেন। হুমায়ুন আজাদের বিষয়ে আমারে হুদাই কেন জড়াইতেছেন।’
এর মধ্যেই মামলার তদন্তভার পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হাজতে গিয়ে আব্বাসের সঙ্গে কথা বলে যান। ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা পাননি জানিয়ে মারধরের মাত্রা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
আব্বাস বলেন, ‘সিআইডির ওই অফিসার আমারে বলে, ‘আপনাকে থানা-পুলিশ এভাবে মারল কেন সেইটাও তো একটা রহস্য’। বাম হাতের আঙুল ভাঙা তিনটা। সবচেয়ে বড় নির্যাতনটা হইছে, উল্টায়া যখন পায়ের তলায় বাড়ি মারে তখন। ১২ দিন জেলে থেকে পরে তাকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি।
সেখানে আসামি করা হয় পাঁচ জঙ্গিকে, যাদের মধ্যে একজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। বাকি চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বুধবারের রায়ে।
আব্বাস বলেন, ‘মুক্তি দিলেও তত দিনে আমাকে সন্ত্রাসী হিসেবে গণমাধ্যমের কাছে চিহ্নিত করে দিছে পুলিশ। নাম বিকৃত করে ‘বোমা আব্বাস’ হিসেবে প্রচার করছে তারা।’
মুক্তির পর সেই নাম তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে বারবার। ক্যাম্পাসে বোমা ফাটলেই পুলিশ তার নামে মামলা দিত। এভাবে অন্তত এক ডজন মামলার আসামি বনে যান তিনি। মামলার আতঙ্ক নিয়েই তখন তার দিন পার করতে হত। ডজনখানেক মামলা চালাতে গিয়ে সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছিল।
‘মা বেঁচে নেই কিন্তু তার কথা বারবার মনে পড়ে। একটা ফ্যামিলিকে ধ্বংস করার জন্য যা করা দরকার আমার সঙ্গে তার সবকিছুই হয়েছে।’
আব্বাস জানান ছোট খাট ব্যবসা করে দিন কাটছে। বাঁ হাতের তিনটা আঙুল ভাঙা, শরীরের নানা জায়গায় এখনো ব্যথা করে। দলেরও কোনো পদেও নেই। সর্বশেষ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাও কয়েক বছর হলো।