ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এখনই প্রতিদিন যানজটে নাকাল হচ্ছে মানুষ। ঈদুল ফিতরে ঘুরমুখী মানুষের চাপ বাড়লে যানজট অহনীয় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মহাসড়কঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পরিবহনের অসংখ্য কাউন্টার। এর সঙ্গে কয়েকশ অবৈধ স্ট্যান্ডের দৌরাত্ম্য এবং হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির কারণে মানুষের ভোগান্তি লেগেই থাকে। এসব বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা না নিলে ঈদে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। যানজটের ভোগান্তি সঙ্গী করেই মানুষকে ফিরতে হবে গ্রামে।
এবার ঈদ ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আটটি স্পটে বেশি যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মহাসড়কের ভুলতা, বরপা, নতুন বাজার, বরাব, বিশ্বরোড, রূপসী, তারাব, কাঞ্চন ও কালাদী অন্যতম। এসব এলাকায় যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে ফ্লাইওভার ব্যবহার না করা, ভুলতা এলাকায় অবৈধ স্ট্যান্ড, ভ্রাম্যমাণ হকার, ট্রাক থামিয়ে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজিকে দায়ী করছেন পরিবহন শ্রমিক ও পথচারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যানজট নিরসনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও এশিয়ান বাইপাস সড়কে ৩৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় তিনতলা ফ্লাইওভার। এতে কোনো ধরনের টোল রাখা হয়নি। এরপরও দূরপাল্লার কিছু বাস ফ্লাইওভার ব্যবহার করলেও বেশিরভাগ পরিবহন নিচ দিয়ে চলাচল করে। এতে নিচে গাড়ির জটলা লেগেই থাকে। যানজট নিরসনে এ ফ্লাইওভার কোনো কাজেই আসছে না।
আবার ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে দেশের অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের বাজার গাউছিয়া মার্কেট। এখানে ঈদ ঘিরে ক্রেতাদের আনাগোনা কয়েক গুণ বেড়েছে। মার্কেটের সামনে মহাসড়ক দখল করে হকাররা দোকান বসিয়েছেন। এর সঙ্গে মহাড়কের গোলাকান্দাইল মোড় ও ভুলতা-মুড়াপাড়া সড়ক মোড়ে রয়েছে অবৈধ সিএনজি ও ইজিবাইক স্ট্যান্ড। ফুটপাতের দোকান ও অবৈধ স্ট্যান্ড ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে প্রশাসনও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। এতে করে রূপসী, বরপা, বরাব, কাঞ্চন, বিশ্বরোড এলাকায় অবৈধ ইজিবাইকের কারণে মুহূর্তে যানজট লেগে যায়।
রূপগঞ্জে ছোটবড় প্রায় হাজারখানেক শিল্পকারখানা রয়েছে, যার বেশিরভাগই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে। কোনো ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় এসব শিল্পকারখানা ছুটি হলে নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থামিয়ে শ্রমিক পারাপার করেন। এতে মুহূর্তে গাড়ির দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। আবার লোকাল বাস ও ফিটনেসবিহীন লেগুনা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করে। অনেক সময় চালকরা উল্টো পথে লেগুনা নিয়ে ঢুকে পড়েন। এতে যানজট মুহূর্তে ভয়াবহ আকার নেয়।
এদিকে রূপগঞ্জ থেকে ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়ক। বর্তমানে সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলায় যানজট দেখা দিচ্ছে। ঈদে এ অবস্থা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পথচারীরা। এখনই কাঞ্চন ব্রিজে ধীরগতির টোল আদায়ের ফলে যানজট গাজীপুর পর্যন্ত চলে যায়। ঈদে এ অবস্থা আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাসচালক রাসেল জানান, ভুলতা এলাকায় গাউছিয়া মার্কেট। এ মার্কেটের সামনে থেকে তারা অনেক যাত্রী পান। এ কারণে বাড়তি কামাইয়ের আশায় নিচ দিয়ে গাড়ি নিয়ে যান। ট্রাকচালক আহমেদ মিয়া বলেন, ‘পুলিশ আমাদের কাগজপত্র দেখার নাম করে আটকে রাখে। টাকা না দিলে হয়রানি করে। দেখা যায় আমার ট্রাক থামিয়ে রাখায় অন্যান্য গাড়ির সারি পড়ে গেছে।’
ভুলতা হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের (ওসি) পরিদর্শক সালাউদ্দিন বলেন, ‘গাড়ি আটকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। আমরা যানজট নিরসনে রাতদিন পরিশ্রম করছি।মহাসড়কঘেঁষা অবৈধ বাসস্ট্যান্ড সরাতে অভিযান চালানো হবে।’
রূপগঞ্জ থানার ওসি এএফএম সায়েদ জানান, ভুলতা এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদে তারা কাজ করছেন। দূরপাল্লার বাসগুলোর ফ্লাইওভার ব্যবহারের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাসস্ট্যান্ডের দুর্জয় মোড়ে এখনই অসহনীয় যানজটে যাত্রীরা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। ঈদুল ফিতরে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই স্থানে যানজটের অন্যতম কারণ শতাধিক অবৈধ বাস কাউন্টার, ফুটপাত দখল করে দোকানপাট, হাজার হাজার সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য।
জানা গেছে, ভৈরবে নির্ধারিত বাস টার্মিনাল থাকার পরও মহাসড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ বাস কাউন্টার। এসব কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী বাসে উঠছেন। মহাসড়কে বাস থামানোয় যানজট বাড়ছে। ভৈরব শহরের সালাহ উদ্দিন, ভৈরবপুর মধ্যপাড়ার জুনায়েদ করিম ও শম্ভুপুরের ইফতেখার হোসেন জানান, এখানে ফ্লাইওভার নির্মাণ ছাড়া যানজট নিরসনের কোনো পথ তারা দেখছেন না।
ভৈরব বাস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহমেদ জানান, মহাসড়কঘেঁষে শতাধিক অবৈধ কাউন্টার, ফুটপাত দখল করে দোকান, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোয় যানজট হচ্ছে। আমি আইন মানব, আপনি মানবেন নাএমন নীতি থেকে প্রশাসন বেরিয়ে না এলে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না বলে তিনি মনে করেন।
‘নিরাপদ সড়ক চাই, ভৈরব শাখা’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. আলাল উদ্দিন বলেন, ‘পরিবহন খাতে জড়িত ক্ষমতাসীনরা। তারা কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে দুর্জয় মোড়ের যানজট দূর হবে না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সবুজ বলেন, ‘আসন্ন ঈদে ঘরমুখোদের যাতায়াত নির্বিঘœ করতে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সভা করা হবে। আশা করছি, সভা থেকে ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত আসবে।’