বাড়ছে নদ-নদীর পানি ফের শঙ্কায় হাওরের কৃষক

আবারও বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে করে পানি বাড়ছে হাওরে। এ কারণে আবার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে হাওরের একমাত্র ফসল।

আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৫০ সেন্টিমিটার। এ ছাড়া জেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদী ও পাটলাই নদেও পানি বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে আবার ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একই সময়ে সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড় হচ্ছে। উজানে বৃষ্টি হওয়ার কারণে সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সুরমা নদীর পানি ছিল ৫ দশমিক ২৯ মিটারে। গতকাল শনিবার বিকেলে সেটা বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৭০ মিটারে। একই সময়ে যাদুকাটায় পানি বেড়েছে ৩০ সেন্টিমিটার, পাটলই নদে বেড়েছে ২৫ সেন্টিমিটার। নদ-নদী ও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ। এ অবস্থায় যেসব হাওরে ধান পেকেছে, সেখানে ধান কাটছেন কৃষকরা। কোনো কোনো হাওরে আতঙ্কে আধা পাকা ধানই কেটে ঘরে তোলা হচ্ছে।

দিরাই উপজেলার টানাখালী হাওরের কৃষক লিটন মিয়া বলেন, ‘হাওরের অনেক ধানই এখনো পাকেনি। পানি এলেও ধান তো কাঁচা, কীভাবে কাটব আর এসব কাঁচা ধান কেটে তো কোনো ফসল পাওয়া যাবে না, শুধু টাকা নষ্ট ছাড়া আর কী হবে।’

একই হাওরের কৃষক জমির আলী বলেন, ‘কয়দিন ধইরাই টেনশনে আছি কেমনে বাঁধ ঠিকাইতাম এখন যদি আবার পানি ওয় তাইলে আর ফসল ঠিকানো যাইত না। সব ধান ওকোনো কাঁচা রইছে।’

তাহিরপুর উপজেলা শনির হাওরের কৃষক কালীপদ দাস বলেন, ‘হাওরের উজানের ঢল প্রথমেই তাহিরপুরে ধাক্কা দেয়। তাই আমরা বেশি চিন্তায় পানি এভাবে বাড়লে বাঁধ আর ফসল কোনোটাই আর রক্ষা নাই।’

গতকাল দুপুরে দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরে ভেঙে যাওয়া বাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো আব্দুর রাজ্জাক জানালেন, হাওরে আগাম বন্যার একটা পূর্বাভাস আছে। তাই ফসল রক্ষায় সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। হাওরের ফসলহানি হলে চালের দাম বাড়বে, এতে সংকট আরও বাড়বে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ মুহিবুর রহমান মানিক, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাংসদ অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি,  সুনামগঞ্জ-সিলেট সংরক্ষিত আসনের সাংসদ অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার খানম,  কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বেনজির আলম, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ২ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ১২টি বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ১৫ হাজার হেক্টর বোরো ফসল। আর জেলার বেশির ভাগ হাওরের বাঁধে দেখা দিয়েছে ফাটল। ফসলডুুবির জন্য বাঁধ নির্মাণে অনিয়মেরর বিষয়ে অনুসন্ধান করছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের দুটি তদন্ত কমিটি।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার প্রায় প্রতিটি হাওরেই শুরু হয়েছে ধান কাটা। তবে আবারও ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলরক্ষা বাঁধ ও ধান নিয়ে শঙ্কায় আছেন কৃষকরা।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিন ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

গত কয়েক দিন কিশোরগঞ্জের নদ-নদীর পানি হ্রাস পেলেও বৃহস্পতিবার থেকে ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীর পানি ফের বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসছে পাড়াড়ি ঢল।

ইটনা উপজেলার কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, হাওরের বোরো ধান নিয়ে কৃষক আবারও খুব চিন্তায় পড়েছেন। কারণ, বাঁধের অবস্থা বেশি ভালো না। যদিও সব সময় বাঁধে কাজ করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল আলম বলেন, কিশোরগঞ্জের প্রায় সব কটি হাওরেই ধান কাটা শুরু হয়েছে। যেসব জমির ধান ৮০ ভাগ পেকেছে, সেই জমির ধান দ্রুত কেটে তোলার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করা হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে হাওর এলাকার অন্তত ৯০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে যাবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক শামীম আলম বলেন, ‘বাঁধগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছি। উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দিনরাত বাঁধের কাজ করছেন।’

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, জেলার খালিয়াজুড়ী উপজেলায় ধনু নদীর পানি ফের বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ধনু নদীর খালিয়াজুড়ী বাজার পয়েন্টে বিপৎসীম ৪.১৫ মি.। ৫ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিপৎসীমা দিয়ে প্রবাহিত হয়। কমতে কমতে ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিপৎসীমার ৫৮ সেমি নিচে নেমেছিল। ফের বাড়তে বাড়তে আজ (শনিবার) বিকেল ৩টার দিকে বিপৎসীমার ১ সেমি নিচে ৪.১৪ মি. দিয়ে ধনু নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফের শঙ্কা ও চিন্তার কথা জানালেন নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী।

এর মধ্যে চলতি বোরো মৌসুমে হাওর এলাকায় ৫১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে প্রকল্পের আওতায় ১৪৬টি ধান কাটার যন্ত্র ভর্তুকি মূল্যে (হারভেস্টার) বিতরণ করা হয়েছে। একই প্রকল্পের আওতায় গত বছর ১০৫টি হারভেস্টার মেশিন কৃষকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগের বছর বিশেষ বরাদ্দের আওয়তায় ৭৯টি হারভেস্টার বিতরণ করা হয়েছিল।