ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার পুরো দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ইন্টারভেনশন বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে না। তিনি বলেন, এই প্রতিবেদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে। এই প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এসময় প্রতিমন্ত্রী র্যাবের ইতিবাচক কর্মকা-ের প্রশংসা করেন। গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে ওই মানবাধিকার প্রতিবেদনের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী একথা বলেন।
২০২১ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় গত ১২ এপ্রিল। ৭৪ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, রাজনৈতিক মামলা হামলার অভিযোগ তোলা হয়। রোহিঙ্গা ইস্যু, বিচার বিভাগ ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বাংলাদেশের এলজিবিটিদের (লেসবিয়ান, সমকামী, রূপান্তরকামী) জন্য বাংলাদেশে আইন নেই এবং বাংলাদেশ তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর দেশটি র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে কিছু উপাদান আছে যেটা আমরা-আপনারা ছোটবেলা থেকে যা শিখেছি, আমাদের ধর্ম যা শিখিয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রের মানুষের যা প্রত্যাশা এর সরাসরি পরিপন্থী। রাষ্ট্র এই রিপোর্টটাকে রেখে দিয়েছে, অ্যাজ এ কান্ট্রি হু লাভস টু বি এনগেইজড উইথ আওয়ার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড অ্যাজ এ রেসপন্সিবল নেশন; আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটার প্রতিটি বিষয় নিয়ে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলব। আমরা ব্যাখ্যা চাইব। যেগুলো বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সরাসরি পরিপন্থী সেগুলো প্রত্যাহার করতে বলব।’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘যেসব সোর্স থেকে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই সোর্সগুলো দুর্বল। আমরা নিকট অতীতে দেখেছি, অল হ্যাড ভেরি ক্লিয়ার পলিটিক্যাল এজেন্ডা। বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্ব আছে যেসব রাষ্ট্রের তারা বাংলাদেশের নিকট অতীতের ইতিহাসটা ভালোভাবে জানবেন বলে আশা করি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নিকট অতীত ভুলে গেলে চলবে না। আমরা মিডিয়াতে দেখেছি, খুবই সেনসিটিভ ইস্যুতে খুবই দায়িত্ববান মানুষ ফেইসবুকে এসে লাইভ করছেন, দাবি করছেন, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। টর্চার করা হয়েছে। এই কারণে যখন তাকে ধরা হলো, তখন তার পক্ষে আবার নেমে গেল।’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার পুরো দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ইন্টারভেনশন বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে না কারও কাছ থেকে।’
র্যাব প্রসঙ্গে এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই বিষয়গুলো বিবেচনা করার জন্য অতীতে বিভিন্ন দেশের সুপারিশে র্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণে র্যাব সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হয়েছে। আমর খুব অল্প সময়ে, যদিও শেষ নয় এই যুদ্ধ, আমরা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিতে জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি এবং মোটামুটি বলা যায় মূল উৎপাটন করতে পেরেছি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্রামে-গঞ্জে যাবেন, র্যাব ইজ আ ব্র্যান্ড নেম ফর পিস। র্যাব ইজ আ ব্র্যান্ড নেম হোয়্যার ইউ গেট জাস্টিস। র্যাব ইজ আ ব্র্যান্ড নেম ফর অ্যান্টি টেরোরিজম অ্যাক্টিভিটিস। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যে কাজগুলো করেছেন, সেখানে যে ব্যত্যয়গুলো হয়েছে সেগুলো নিয়েও আমরা এখন কাজ করছি। আমরা এ ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলছি। ফোর্স অপারেট যারা আছেন তারা বাকিটুকু টেকনিক্যাল বিষয় যেগুলো আছে সেগুলো আমাদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় না; আমি নিশ্চিত, তারা সেগুলো রিভিউ করছেন বা করবেন। আমাদের এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেওয়ার কোনো অপচেষ্টা আমরা ভালোভাবে নিতে পারব না।
এসময় প্রতিমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঝুঁকির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত যে কোনো সপ্তাহের যদি হিসাব নেন, গান রানিং-ড্রাগ ট্রাফিকিং বেড়েছে। প্রতিনিয়ত তারা নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হচ্ছেন। মুহিব উল্লাহর মতো একজন মিয়ানমারের নাগরিক জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যস্ত ছিলেন, তাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া উচিত। আমরা ধরে নিচ্ছি, ফিরে যাবে না এ রকম একটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল; তাকে হত্যা করা হলো। সেখানে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কতটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ রকম একাধিক রোহিঙ্গা নেতা আছেন যাদের আমাদের পুলিশ-র্যাবের সদস্যরা সেফটি-সিকিউরিটি দিয়ে থাকেন। বডিগার্ড হিসেবে কাজ করে থাকেন।’
প্রতিবেদনের ত্রুটি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই রিপোর্টে অনেক কিছু আছে, যা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে গত এক দশকে অনেক উন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রম খাত। অথচ পুরো রিপোর্টে এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নেই। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই এ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে।’
দেশের অগ্রগতির কোনো ছাপ এ রিপোর্টে নেই উল্লেখ করে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়টাতে। যাত্রার এই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ যতদূর এসেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছে এটার কোনো প্রশংসা এ রিপোর্টে নেই। বাংলাদেশ লেবার ইমপ্রুভমেন্টের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ স্ট্যান্ডার্ড হয়েছে বলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু রিপোর্টে এর কোনো ছাপ নেই। আমরা যে এত পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি, এটার কোনো প্রশংসা নেই।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, গত মাসে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী জেনেভায় গিয়েছিলেন, সেখানে আমরা ডকুমেন্ট হস্তান্তর করেছি। যে ক্ষেত্রেগুলোতে আমরা কাজ করছি, গোস উইদাউট সেইং বাংলাদেশের মানুষের ভোট এবং ভাতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আমাদেরও কিছুটা খেদ আছে। কিন্তু সেটার জন্য রেসপন্সিবিলিটি আদৌ আমাদের কি না; এক হাতে তো তালি বাজে না! একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে গেলে যে আরও দল লাগে। ওগুলো তাদের ব্যর্থতা।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো এ ধরনের সমস্যায় যে কোনো সময় পড়তে পারে। কারণ যে অঞ্চলে আমরা বসবাস করি, এই অঞ্চলের ইতিহাস ভালো না। এ অঞ্চলে বর্তমানও অনেক দেশে ভালো নয় এবং নিকট ভবিষ্যৎও ভালো মনে হচ্ছে না। সেই জায়গায় বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে যারা দেখতে চান একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র যেখানে মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, যেখানে সবার মতামত দেওয়ার মতো পরিবেশ অব্যাহত থাকবে এই কাজগুলো করতে গেলে আমাদের জাতির গর্বের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।’