ইসিকে আস্থার সংকট কাটানোর পরামর্শ সাংবাদিকদের

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর আস্থার সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। এছাড়া ইসিকে ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতি মেনে চলার পাশাপাশি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আনার বিষয়ে কাজ করার কথাও বলেছেন তারা।

গতকাল সোমবার ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে ইসির সংলাপে এ আহ্বান জানানো হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে এ সংলাপ হয়।

সংলাপে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না, সেটা জোর (ফোর্স) করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কমিশনের দায়িত্ব থাকবে সবাইকে নির্বাচনে অংশ নিতে আহ্বান জানানো। সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না। গণতন্ত্র বিকশিত হবে না।

সিইসিকে যেসব পরামর্শ দিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা : একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘আপনাদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। নির্বাচনে কাউকে আনা বা না আনা কিংবা দল ভাঙার কাজ আপনাদের নয়।’

সংলাপে আরটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক রহমান বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের বাইরে এবং ভেতরে একটি করে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা যেতে পারে। ২৪ ঘণ্টা বা ৩৬ ঘণ্টা আগেই যদি সেটা ব্যবস্থা করে ফেলি, তাহলে আমরা দেখতেই পাচ্ছি কে রাতের বেলা ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটবাক্স ভর্তি করে রেখে গেল এবং দিনের বেলায় কে কাকে ঢুকতে দিচ্ছে না, কোথায় কারচুপি হচ্ছে।’

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, ‘বিশ্বাসযোগ্যতার একটা সংকট রয়েছে। সেটা যদি কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলে সেটা হবে আপনাদের বড় সাফল্য। সাধারণ মানুষের আপনাদের বিশ্বাস করতে হবে, গণমাধ্যমের আপনাদের বিশ্বাস করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আপনাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। তাহলে সবাই নির্বাচনে আসবে।’

বিএফইউজের সাবেক সভাপতি ও সিটিজেন টিভির সিইও মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘এখানে দুটো বিষয় করতে হবে। একটা হলো আস্থার সংকট, আরেকটা ইভিএমের ত্রুটি। এগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।’

বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ মাসুদ কামাল আস্থার সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ নির্বাচন কমিশনের কথা বিশ্বাস করে না। এ বিশ্বাসের পরিমাণ গত দুটো নির্বাচনে শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষের কাছে আপনাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না, আস্থা অর্জন করতে পারলেন কি না, জানতে আগের দুটো নির্বাচন মূল্যায়ন করেন।’

মাছরাঙা টিভির হেড অব নিউজ রেজোয়ানুল হক রাজা বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ইসির বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা থাকতে হবে।’

ইনডিপেনডেন্ট টিভির চিফ নিউজ এডিটর আশিস সৈকত বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানে ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে আপনাদের, সরকারে কে থাকল সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা দানিশ বলেন, ‘বড় দলগুলোর অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যদি ভালো নির্বাচন করতে হয় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। তাদের গুডবুকে না নিতে পারলে কাজ উঠবে না।’

এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন বলেন, ‘ইসি চায় নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ থাকুক। আমি আশা করি, আপনারা চেষ্টা করবেন যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে এরকম একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার।’ ইসি যেন সিইসিকেন্দ্রিক হয়ে না উঠে, সেদিকে দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

ফোর্স নয়, আহ্বান জানাব সিইসি : সাংবাদিকদের বক্তব্য শেষে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল জানান, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রচেষ্টা তারা অব্যাহত রাখলেও কাউকে ভোটে অংশগ্রহণে বাধ্য করা তাদের দায়িত্ব নয়। তিনি বলেন, ‘আপনারা বলেছেন, আগামীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও সংলাপ করার, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা করার কথা বলেছেন কেউ কেউ। কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না, সেটা ফোর্স করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব থাকবে সবাইকে আহ্বান করা, আপনারা আসেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।’

সিইসি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে সবাই অংশগ্রহণ না করলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। নির্বাচনগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়া উচিত। এখানে দুটো পক্ষ থাকে। দুটো পক্ষকে খেলতে হবে। তাহলে নির্বাচনটা সহজ হয়।’ সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ইসির পাশাপাশি গণমাধ্যমসহ সবাইকে চেষ্টা করতে হবেও বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘যদি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য আপনাদের কাছে আসে, তথ্য দিতে পারেন; আমাদের দায়িত্ব হবে তখন পুরো সংসদীয় আসনের নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে কমিশনের দায়িত্ব ও সাহসের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন তিনি।

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য থাকে ইলেকশনটা ফ্রি ফ্রম হস্তক্ষেপ এটা যেন হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। সেটা নিশ্চিত করতে যা যা করণীয়, আমাদের করতে হবে।’ ইভিএম নিয়ে সিইসি বলেন, ‘অধিকাংশই ইভিএমের পক্ষে মত দিয়েছেন। এ যন্ত্রে পেশিশক্তির ব্যবহার করা যায় না, জালিয়াতি করার সুযোগ নেই। আরও কতগুলো ভালো দিক রয়েছে। কেউ কেউ বিপক্ষে বলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু স্টাডি করছি। আমরা কতগুলো সভা করেছি। আমরা ওপেন হতে চাই। যদি ত্রুটি থাকে, তা কাটিয়ে আপনারা ব্যবহার করতে বলেছেন। অবশ্যই আমরা সেটা দেখব।’

সংলাপে যারা উপস্থিত ছিলেন : সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন সংবাদপত্রের মধ্যে অংশ নেন বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, জাগো নিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কেএম জিয়াউল হক এবং বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ মাসুদ কামাল। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ও মোস্তফা ফিরোজও উপস্থিত ছিলেন সংলাপে।

টেলিভিশনগুলোর মধ্যে সংলাপে ছিলেন ডিবিসি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম, একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, গ্লোবাল টিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, একুশে টিভির হেড অব নিউজ রাশেদ চৌধুরী, আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিক রহমান, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন, নিউজ ২৪-এর নির্বাহী সম্পাদক রাহুল রাহা, স্পাইস টিভির এডিটরিয়াল হেড তুষার আবদুল্লাহ, চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম, বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ আব্দুল হাই সিদ্দিক, মাইটিভির হেড অব নিউজ শেখ নাজমুল হক সৈকত, সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা দানিশ, ইনডিপেনডেন্ট টিভির চিফ নিউজ এডিটর আশিস সৈকত, মাছরাঙা টিভির হেড অব নিউজ রেজোয়ানুল হক রাজা, চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন, নাগরিক টিভির হেড অব নিউজ দীপ আজাদ, দেশ টিভির চিফ নিউজ এডিটর বোরহানুল হক সম্রাট।

চার নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা এমিলি, মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন সংলাপে।

বর্তমান ইসি গত ১৩ মার্চ প্রথম দফায় ৩০ শিক্ষাবিদকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাতে সাড়া দিয়ে ১৫ জন উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় দফার সংলাপে ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ জানালে সংলাপে অংশ নেন ১৯ জন। আর তৃতীয় দফা সংলাপে আমন্ত্রিত ৩৪ সাংবাদিকের মধ্যে ২৩ জন অংশ নেন।

কেএম নুরুল হুদা কমিশন দায়িত্ব হস্তান্তর করলে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সিইসি হিসেবে শপথ নেন কাজী হাবিবুল আউয়াল।