ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষ উত্তরের পথে টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক ব্যবহারে যানজটের আশঙ্কা করছেন। এর মধ্যে গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটারকে সবচেয়ে যানজটপ্রবণ মনে করছে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে কী কারণে এই এলাকায় যানজট হতে পারে তা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পরে ১২টি স্পট ও নলকা নতুন সেতুকে যানজটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। এ সড়কের কোথাও খানাখন্দ, কোথাও সরু; আবার কোথাও চার লেনের কাজ চলমান থাকায় যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ঈদ মৌসুমে গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গাড়ির চাপ ও টোল আদায়ে বেগ পেতে হয় কর্র্তৃপক্ষকে। ফলে এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্প্রতি সভা করে। সেখানে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কজুড়ে কী কী কারণে যানজট হতে পারে তা চিহ্নিত করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ। সভায় দীর্ঘ ৭০ কিলোমিটার সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের গাড়ি দুই লেনে চলাচল, সিরাজগঞ্জে রাস্তার কাজ চলমান থাকায় ধীরগতি ও বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় দেরিকে। পুলিশ বলছে, ঈদযাত্রায় যানবাহন চলাচল নির্বিঘœ করতে মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশে আট এবং সিরাজগঞ্জ অংশে তিন শতাধিক মিলিয়ে ১১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে থাকবে ভ্রাম্যমাণ টিম।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরবঙ্গে প্রবেশধারখ্যাত এলেঙ্গা মহাসড়কে দুই লেনে গাড়ি প্রবেশ করছে। বাসস্ট্যান্ডের সার্ভিস লেনের প্রায় এক কিলোমিটার মালবাহী গাড়ি দখল করে রেখেছে। ভারী যানবাহন সার্ভিস লেন দখলে রাখায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক মহাসড়কে উঠে পড়ছে। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এলেঙ্গা-জয়দেবপুর চাল লেনের কাজ চলমান থাকলেও মহাসড়কের কোথাও কোথাও খানাখন্দ দেখা দিয়েছে। এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ১৮টি সরু সেতুতে পাশাপাশি দুটি গাড়ি ক্রসিংয়ে সমস্যা হয়। এ কারণে শুধু ঈদ নয়, বছরজুড়েই থাকে যানজট।
টাঙ্গাইল জেলা ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) এশরাজুল হক জানান, করোনার কারণে গত দুই বছর ঈদে তেমন চাপ ছিল না। নিশ্চিতভাবেই এবার গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বাড়বে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কাজ শেষ হওয়ায় গাড়ির গতিও বেড়েছে। তবে চার লেনের গাড়ি এলেঙ্গা গিয়ে দুই লেনে প্রবেশ করায় ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তবে এবার টাঙ্গাইলের চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে সিরাজগঞ্জ মহাসড়ক।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, ‘ঈদযাত্রায় মহাসড়কে আট শতাধিক পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার সড়ক আট ভাগে ভাগ করে যানজট নিরসনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরু ১৮টি সেতু এলাকায় আলাদা পুলিশ মোতায়েন করা হবে। আশা করছি, মানুষ নির্বিঘেœ বাড়ি ফিরতে পারবেন।’
বঙ্গবন্ধু সেতুর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আহসান মাসুদ বাপ্পি বলেন, ‘সেতুর নয়টি টোল বক্সের সাতটিতে মাঝারি ও ভারী যান প্রবেশ করবে। বাকি দুটি মোটরসাইকেলের জন্য রাখা হবে। আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করছি, কোনো ঝামেলা হবে না।’
এদিকে ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ২২ জেলায় যাতায়াতে ১২টি স্পটে ভোগান্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এগুলো হলো বঙ্গবন্ধু গোলচত্বর, সয়দাবাদ মোড়, মুলিবাড়ি মোড়, কড্ডার মোড়, কোনাবাড়ি, নলকা সেতু, হাটিকুমরুল গোলচত্বর, ঘুড়কা, দাদপুর, সাহেবগঞ্জ, ষোল মাইল ও চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ থেকে চার লেনে উন্নীতের কাজ চলমান থাকায় বেশিরভাগ এলাকা সরু হয়ে গেছে। অনেক স্থানে বড় বড় খানাখন্দ দেখা দিয়েছে। সরু নলকা সেতুতে যানবাহন প্রবেশে সমস্যার কারণে ঈদযাত্রা স্বস্তির হবে না বলে আশঙ্কা করছেন চলাচলকারীরা।
যদিও নলকার নতুন সেতু নির্মাণ সংস্থা মীর আক্তার লিমিটেডের ডেপুটি প্রকল্প ব্যবস্থাপক শেরশাহ ফরিদ জানান, তারা রাত-দিন কাজ করছেন। ঈদের আগে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে নতুন সেতুর একটি লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এতে নলকা এলাকায় যানজটের সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।
বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্তকরণ কাজ চলছে। এ কাজের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় ঈদে তার প্রভাব পড়বে। সড়কে চলাচলকারী যাত্রী খায়রুল ইসলাম, লালন শেখসহ কয়েকজন জানান প্রশস্তকরণের কাজ চলায় সড়কের বিভিন্ন জায়গা এক লেনে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে নলকা নতুন সেতু চালু না হলে যানজট ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
এসআই পরিবহনের বাসচালক হাফিজুর রহমান, এসটি পরিবহনের শাহ আলম ও দেশ পরিবহনের ওবায়দুল ইসলাম জানান এ মহাসড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। ঈদে ঘুরমুখীদের ঢল নামবে। ফলে নলকা নতুন সেতু চালু না হলে তাদের কপালে দুর্ভোগ রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম বলেন, ‘ঈদযাত্রায় মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে ভ্রাম্যমাণ টিমসহ তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন থাকবে। কেউ বিশৃঙ্খলা করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক পরিদর্শক আবদুল কাদের বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘেœ সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ একযোগে কাজ করছে। মহাসড়কের মুলিবাড়ি থেকে সিরাজগঞ্জ শহরে ঢোকার বিকল্প সড়ক বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এটি করা গেলে শহর যানজটমুক্ত থাকবে।