বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও নিবিড় করার অঙ্গীকার

কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তীতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও নিবিড় ও বেগবান করার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর। গতকাল সোমবার সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে সম্মত হয় উভয় দেশ। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে তারা গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এবং সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান নিজ নিজ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে এবং আসিয়ান ফোরামে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করতে সিঙ্গাপুর সরকারের সহায়তা কামনা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয় ক্ষেত্রেই তার সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা জানান।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সিঙ্গাপুরের বিশেষ অ্যাওয়ার্ড চালুর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিঙ্গাপুরের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দ্রুততম সময়ে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বিষয়ক চলমান আলাপ-আলোচনা শেষ করে এ চুক্তি স্বাক্ষর, শিক্ষার্থী ও পেশাদার পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বৃত্তি চালু, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ ও স্বার্থসংরক্ষণসহ বিবিধ দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান এসব বিষয়ে তার সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চলতি বছরে তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ সফরের ইচ্ছার কথা জানান।

‘বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবন বাজি রেখে সাড়া দেন কূটনীতিকরা’ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে ৬৫ জন কূটনীতিক তাদের জীবন বাজি রেখে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে আরও ২২ জন কূটনৈতিক পদত্যাগ করেন এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বেকায়দায় পড়ে। এর ফলে পাকিস্তান সরকারের ওপর বহির্বিশ্ব থেকে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়।

গতকাল ফরেন সার্ভিস ডে উপলক্ষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুর থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই দিনটি ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও সম্মানের।’

বিদেশে কূটনীতিকদের তৎপরতাই বিশ্বজনমত গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে ড. মোমেন বলেন, ‘আমরা সেসব কূটনীতিকদের একটি বড় আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে চাই।’

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তরুণ বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রলোভন দেখিয়েও পাকিস্তানের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন এক পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে দৃঢ় ছিলেন সেটাই আমাকে ভাবিয়ে তোলে।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সচিব) মাসুদ বিন মোমেন স্বাধীনতা যুদ্ধে কূটনীতিকদের বিদেশে তৎপরতার অবদান উল্লেখ করে বলেন, ‘তাদের মহান ভূমিকার জন্যই আজ আমরা কূটনৈতিক রেডিমেড প্ল্যাটফর্ম পেয়েছি। তাই আমরা তাদের অবদানকে স্মরণে রাখতে চাই।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতাটা ছিল একটি জনযুদ্ধ। সেদিন আমাদের তিনজন রাষ্ট্রদূত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন স্বাধীনতা পদক পেলেও তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়। কারণ তার কাছে তো মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেই। বিদেশে বাংলাদেশের দূত হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।’

বীরশ্রেষ্ঠ ও বীরউত্তমদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ দরকার হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে বিদেশের মাটিতে যারা দেশের জন্য যুদ্ধটা চালিয়ে গেলেন তাদের কেন গেজেটভুক্ত হতে সনদ দরকার হবে?’

এতে বক্তব্য রাখেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন কূটনীতিকরা।