রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যা মামলার তদন্ত আটকে আছে শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ ওরফে আকাশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায়। হত্যাকাণ্ডের সময় যে অস্ত্র ও মোটরসাইকেল ব্যবহার হয়েছে সেগুলো উদ্ধার ও সরবরাহকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই তদন্তের জট খোলার পাশাপাশি শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা সহজ হবে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
এদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও অস্ত্র উদ্ধার এবং কিলিং মিশনে অর্থ সরবরাহকারী, মূল পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশ নিহত টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি।
তিনি গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার স্বামী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতাদের কেউ ধরা পড়েনি। কারা কেন আমার স্বামীকে হত্যা করল, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। অন্যথায় এই অপরাধীরা এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করেই যাবে।’
তবে টিপু হত্যার মদদদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রিফাত রহমান শামীম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিপু হত্যা মামলায় শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আমাদের একাধিক টিম এই হত্যা মামলার তদন্তে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের সঙ্গে প্রতিদিনই তদন্ত কার্যক্রমের ফলোআপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করার জন্য নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। মদদদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা চলছে। অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং এগুলোর সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই তদন্তের জট খুলে যাবে।’
নিহত টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলির হতাশা প্রসঙ্গে এই ডিবি কর্মকর্তা বলেন, ‘তার মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তদন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যেকোনো ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য সময় দিতে হয়। আমরা যে পদ্ধতিতে শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করেছি, সেভাবেই অন্য অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমরা বসে নেই। সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতাদের গ্রেপ্তারের জন্য।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘টিপু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ হওয়ায় তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেছে। তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া অনেক ব্যক্তিকে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। অস্ত্র ও মোটরসাইকেল সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা সহজ হবে।’
গত ২৪ মার্চ রাত পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলায় ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে অস্ত্রধারীর গুলিতে নিহত হন টিপু। এ সময় পাশেই রিকশায় থাকা কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতিও একই অস্ত্রধারীর ছোড়া এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হন টিপুর গাড়িচালক মুন্না। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই শাহজাহানপুর থানায় নিহত টিপুর স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি মামলা করেন।
টিপু হত্যার পরপরই বগুড়া থেকে শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে র্যাব ও ডিবি আরও ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, টিপু হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী ছিলেন সুমন শিকদার ওরফে মুসা। যিনি দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বাকি সব আসামি এখনো দেশেই আছে বলে জানিয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠভাজনরা জানান, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ২০১৯ সাল থেকে ওই এলাকায় রাজনৈতিক জনসংযোগ বাড়িয়ে দেন। এতে তার জনপ্রিয়তাও বাড়ছিল। আওয়ামী লীগের পরবর্তী কমিটিতে মতিঝিল থানার সভাপতি পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তিনি।